সব কিছু
লক্ষ্মীপুর রবিবার , ২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

মেঘনাপাড়ের ছিন্নমূল শিশুরা বেড়ে ওঠছে অযত্ন-অবেহেলায়

মেঘনাপাড়ের ছিন্নমূল শিশুরা বেড়ে ওঠছে অযত্ন-অবেহেলায়

জুনাইদ আল হাবিব: নিরব(৮), শরিফ(৬), সালেহ উদ্দিন (১২), সুমন(১০), রিয়াজ(৯), শাকিল (১২) একই পাড়ার শিশু। কেউ মা হারিয়েছে, কেউবা মা-বাবা দু’জনকেই। নিরব, শরিফ, সালেহ উদ্দিন তি’জনেরই ভিটে-মাটি মেঘনা গিলেছে। শৈশবেই নিরব

হারিয়েছ বাবা’কে আর শরিফ হারিয়েছে মা’কে। সুমন, রিয়াজের মা- বাবা ঠিকই আছে। কিন্তু দারিদ্রের শেকলে বন্দি ওদের বেড়ে ওঠা। আর সালেহ উদ্দিন প্রতিবন্ধি, যেন সংসারের বোঝা। শাকিলের জন্ম ভূমিহীন পরিবারে। স্কুলের খাতায় ওর নাম থাকলেও এখন রিকশা চালাচ্ছে। সংসারের ভার যেন তার কাঁধে।

ওই পাড়ার অদূরেই পাশের গ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ একটি মহল্লার শিশুদের কথা শুনা যাক। রাসেল(৬), সাইফুল(৭), আরিফ(৬), রাজু(৮), সবুজ(১০), মোক্তার(১১), ফরহাদ (৬), রাকিব(৬), জোয়াবেদ (৬),শামীম (৭), সহেল(১২) ওদের বাসস্থান বস্তিতেই। মেঘনার ভাঙ্গনের তাড়ায় ওরাও মানুষের আশ্রয়ে একসাথে। ওদের সাথে দেখা খেলা অবস্থায়। বেশির ভাগ শিশুর গায়ে ধুলোবালি আর ছেড়া পোশাক।

এটা লক্ষ্মীপরের মেঘনাপাড়ের হাজারো শিশুর গল্প। এখনকার শিশুদের শৈশব কাটে এখন অবহেলা-অযত্নে। ওরা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় অস্বাভাবিক জীবন পার করছে। ওরা অনেকেই কখনো বিদ্যালয়ে পা রাখেনি। অথবা কেউ পা রাখলেও তাদের ভাগ্যে ছোঁয়া লাগেনি শিক্ষার আলোর। অনেকেরই হয়তো বিদ্যালয়ের খাতায় নাম ভরাট। কিন্তু ওদের ওখানে দেখা মিলেনা। ওদের দেখা যায়, শ্রমিকের বেশে কিংবা হেলে ধুলে সময় শেষ করা অবস্থায়। গল্পটা উপকূলের বিপন্ন জনপদ লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মেঘনাতীরের।

নিরবের কাছ থেকে তার অবস্থা জানতে চাইলে সে জানায়, “মা আর আমিই একা সংসারে। গাঙ্গে ভাঙ্গার আগেই আব্বা মরি গেছে। আমরা এখন আরেক বাড়িতে ঘর উড়াই থাই।” পড়াশুনার কথা জানতে চাইলে নিরবের ভাষ্য, “পড়ালেখা এত সোজা? বাবা নেই, মা অসুস্থ। কে আমাকে স্কুলে যাওয়ার পয়সা দেবে? পড়লে বেতন দিবে কে? তাছাড়া আমার খাতা-কলম কে দেবে?” অন্যদিকে নদীতে ভাসমান জেলে সম্প্রদায়ের জীবন কাটছে অযত্নে আর অবহেলায়।

লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীরহাটের মেঘনাতীরের মানতা শিশু আবুল বাশার(১২)। বাবা বাচ্চু মাঝির(৩৭) সাথে নৌকার জাল ঠিক-ঠাকে ব্যস্ত সময় পার করছে। বাবার সামনেই তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি পড়ো? না। এভাবেই নদীতে যাও মাছ ধরতে? ছোটকাল থেকেই যাই। তো তোমার পড়তে ইচ্ছে করেনা? হ্যাঁ, করে। এরপরেই তার মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

কারণ, বাবার সামনে সে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলবে না। তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তখন তিনি বলছিলেন, “জন্মের হর(৩৭বছর) ধরি আঁই ইয়ানে থাই। আঁর কোন জাগা-জমি নাই। হোলা-হাইন নিয়ে বোটে থাইকা, মাছ ধরলে পেটে ভাত জোটে। এই ছাড়া আর কোন কিচ্ছু করার উপাই নাই।

আমরা গাঙ্গে গেলে যা পাই, হেইড্যা দিয়াই জীবন কাডাই।” জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে(Convention on the Rights of the Child, CRC) ১৯১টি দেশের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারীদের অন্যতম। ১৯৯০ সালের আগস্টে স্বাক্ষর করলেও ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ এ সনদ গ্রহণ করে।

ইতোমধ্যে ২৬টি বছর অতিক্রম হলেও এর সুফল ফিরেনি প্রান্তিক জনপদের এই ছিন্নমূল শিশুদের মাঝে।

ছিন্নমূলদের নিয়ে কাজ করেন সমাজকর্মী মিসেস রেবেকা মহসিন। তিনি এশিয়া ছিন্নমূল মানবাধিকার ফাউন্ডেশন লক্ষ্মীপুরের পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান। তিনি বলছিলেন, সমাজের এসব ছিন্নমূল শিশুদের সুরক্ষায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বদলাইনি। আমি চেষ্টা করছি নিজে এবং বিত্তবানদের নিয়ে ওদের বেড়ে ওঠায় সহযোগিতা করা। কিন্তু এসব কাজে মানুষের তেমন সার্পোট না মিলায় ওদের নিয়ে কাজ করার চিন্তাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। আসলে ওদেরকে মানুষের মতো দেখে তাদের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

অনুসন্ধান আরও সংবাদ

লক্ষ্মীপুরে সাইরেন বাজানো এ নব্য ভিআইপি কারা ?

মরতে বসেছে ভুলুয়া নদী

লক্ষ্মীপুর ট্র্যাজেডি: যে কারণে সড়কে প্রাণ দিল একই পরিবারের ৬ ব্যক্তি

অল্প বয়সেই তারা দক্ষ শ্রমিক

জলবায়ু ঝুঁকিতে লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় শিশুরা

ওরা স্কুল থেকে নৌকায়

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]