সব কিছু
লক্ষ্মীপুর রবিবার , ২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

অল্প বয়সেই তারা দক্ষ শ্রমিক

অল্প বয়সেই তারা দক্ষ শ্রমিক

জুনাইদ আল হাবিব: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাইয়ে নিতে না পারায় অনেক শিশু জীবনের শুরুতেই মারা যান। অযত্ন-অবহেলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৃত্যু ঝুঁকির মাঝে বেড়ে ওঠছে শিশুরা। এসব শিশুদের নিয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অনেক তথ্য। মাঠ পর্যারের তথ্য সংগ্রহ করে এ নিয়ে দশ পর্বের ধারাবাহিক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরের শিক্ষানবীশ কন্ট্রিবিউটর জুনাইদ আল হাবিব। আজ পড়ুন এর ৪র্থ পর্ব…

শরিফ হোসেন। বয়স ঠিক ১৫। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদরের চর উভূতি গ্রামে। দারিদ্রতার পিছুটানে শরিফদের সংসার। ৮বছর বয়সেই জীবিকা শুরু করে ও। স্কুলের ৩য় শ্রেণিতে পড়াবস্থায় তার বাবা তাকে পাঠিয়ে দেয় বরফ কারখানায়। ওর ঠাঁই হয়েছিলো ওখানেই।

পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সে শ্রম দিচ্ছে। দক্ষতার সাথে বড়দের মতেও ওর একই কাজ। বরফ কারখানার বরফ মেশিনের মাধ্যমে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা, পানি সরবরাহ করা, বরফের বোঝা মাথায় করে স্থানান্তর এগুলোই তার নিত্য দিনের কাজ ছিলো। কিন্তু হঠাৎ একদিন ওর জীবনে নেমে এলো অভিশাপের ছায়া। ভাগ্যের এ কী নির্মম পরিহাস, ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে বরফ কারখানার মেশিনের সাথে লেগে বিচ্ছিন্ন যায় তার বাম হাতটি।

যোগ হয় সংসারে নতুন হতাশা। অর্থ সংকটে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলো শরিফ। শরিফ বলছিলো, “কাজ করতে এসেছে পড়ালেখাও করতে পারিনি, হাতও হারালাম। পড়ালেখার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলাম। প্রতিদিন কাজে আসলে যে ১৫০-২০০ টাকা পাই এতে মনের তৃপ্তি মিটছেনা। পড়ালেখা না করতে পেরে আমি এখন বুঝতে পারছি পড়ালেখার প্রয়োজনটা কতটুকু।” জেলা কমলনগর উপকূল। নাছিরগঞ্জ মেঘনাপাড়। কূলেই দেখা মিলে শিশু জামাল(১২) এর সাথে। জাল বুনে বাবার কষ্টের সঙ্গি সে। জামাল জানায়, “গভীর নদীর বুকে জাল ফেলি। সময় হলে জাল টেনে টেনে ইলিশ ধরি।

নৌকার মেশিন চালু করে নৌকা চালাই। মাঝে মাঝে নৌকার ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করা পানিও বের করে দিই।” পাশের গ্রাম চর মার্টিনের শিশু রিপন(১৫)। ইট-ভাটাতে ইট স্থানান্তরের কাজে যুক্ত সে। আয় করে সংসার চালায়। রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম। যত ইট স্থানান্তর আনা নেওয়া যায়, ততই তার বিল বাড়ে। এভাবেই বড়দের কাজে প্রতিযোগিতায় সে। আয়ের সুবাধে কিছু দিন আগে অভিভাবকদের সমর্থনে বিয়েও করেছে সে! তার মতই এভাবে হাজারো শিশুর জীবনের গতি পথ হারিয়ে স্বপ্নগুলো নিঃশেষ।

তাদের ভবিষ্যত ধ্বংসের পেছনে অভিভাবকদের চরম অজ্ঞতা আর অসচেতনতাকে দায়ি করছেন কেউ কেউ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কমলনগরের আবাসিক মেডিকেল অফিসার(আরএমও) ডা. মীর মো. আমিনুল ইসলাম মঞ্জুর কাছে জানতে চাইলে তিনি অবশ্য বলছিলেন, “শিশু শ্রম শিশুর শারীরিক ও মানসিক দু’টো দিকের বৃদ্ধিতে বাঁধাগ্রস্ত করে। বিশেষ করে তার শরীর ভেঙ্গে পড়বে এবং কর্মদক্ষতা হারিয়ে ফেলবে। যা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের পদে পদে ভুগতে হবে।

অন্যদিকে, যে শিশুর থাকার কথা পড়া-লেখা কিংবা খেলাধুলায়। সে শিশু হয়তো শিশু শ্রমেই ডুবে থাকে। এতে তার ওপর মানসিক চাপ তীব্রভাবে আঘাত করে। অন্য শিশুরা যেভাবে পড়তে যায়, সে তাদের পড়তে যাওয়া দেখে মনে মনে অনেক যন্ত্রণায় ভুগে। এতে তার মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। নিজের প্রতি ভিন্ন ধরণের ঘৃণা জন্মে। যা তাকে সামাজিক বিভিন্ন অপরাধের দিকে ঝুঁকে নিচ্ছে। তার বুদ্ধি ও জ্ঞানের পরিধি অন্যদের চেয়েও সীমিত হয়ে।

ফলে জীবন চলার পথে অন্ধকার নেমে আসে।” লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মাহবুবে এলাহি সানি মনে করেন, “পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে শিশুরা কারো গ্যারেজে, কারো বাড়িতে, কারো অধীনে, ইটভাটায়, সিএনজিতে, নৌকায়, বরফ কারখানাসহ অন্যান্য কাজে যুক্ত হয়।

এদের মধ্যে শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। যারা মাধ্যমিক স্তরে শিশু শ্রমিক ছিলো। এরা যখন কলেজ জীবনে তরুণ হয়ে আসে, তখন তাদের শারীরিক-মানসিক দু’টোরও ক্ষতিসাধন লক্ষ্য করার মতো। বিশেষ করে, শরীর ভেঙ্গে পড়ে। এতে মানসিকভাবেও সে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যার প্রতিফলন পড়ে তার রেজাল্টের ওপর। মানসিক সমস্যার কারণে তারা আশানুরুপ ফলাফল অর্জনে ব্যার্থ হয়।

সে ভালো ফলাফল অর্জন করে ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় না। এগুলোর পেছনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে শিশু শ্রম দায়ী। এজন্য ওদের সুষ্ঠু প্রতিভার বিকাশে সরকারিভাবে উদ্যোগী কর্মসূচি নিতে হবে। যাতে ওদের জীবনটা আরো মসৃণ হয়, আরো আলোর ছোঁয়া পায়।”

তৃতীয় পর্ব: জলবায়ু ঝুঁকিতে লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় শিশুরা

দ্বিতীয় পর্ব: ওরা স্কুল থেকে নৌকায়

প্রথম পর্ব: মেঘনাপাড়ের ছিন্নমূল শিশুরা বেড়ে ওঠছে অযত্ন-অবেহেলায়

জীবিকা আরও সংবাদ

অল্প বয়সেই তারা দক্ষ শ্রমিক

মেঘনায় মাছ নেই, জেলেদের ঈদের কথা কেউ ভাবেনি

ভ্রাম্যমান সেলুনেই চলছে দেলোয়ারের জীবন সংগ্রাম

“জাহিদুল আলম পিয়াস” তথ্যসেবায় লক্ষ্মীপুরের এক বিরামহীন সৈনিক

রামগঞ্জে মৃত্যুর পর ভিক্ষুকের ঘরে ২ লাখ টাকার সন্ধান

উপকূলীয় মেঘনার আবহেলিত জেলেদের জীবন-জীবিকা

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]