সব কিছু
লক্ষ্মীপুর রবিবার , ২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

রণ কৌশল না জানলে যুদ্ধে জয় করা যায়না

রণ কৌশল না জানলে যুদ্ধে জয় করা যায়না

মোহাম্মদ আলী হোসেন: যুদ্ধজয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে রণ কৌশল নির্ধারণ। রণনীতি প্রণয়ন এবং রণকৌশলে ভুল হলে পরাজয় নিশ্চিত। নির্বাচন বা ভোট করাও একটি জনযুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয় পরাজয় দুটোই নির্ভর করে সেনাপতির রণ কৌশলের উপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশেও এমনই এক যুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তি ঘটলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই যুদ্ধে আবারও নিরঙ্কুশ জয় পেল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
এনিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আওয়ামী লীগ হ্যাটট্রিক জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন, সংগ্রাম এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি সর্বসাধারণের দল। এই দলের নেতৃত্বের অগ্রভাগে থাকা নেতৃবৃন্দ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে রাজনীতি করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হওয়ায় এই দলের সাথে সম্পৃক্ত নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরণের অহমিকা এবং আত্ম সন্মানবোধ দারুনভাবে কাজ করে। এর মধ্যে সবসময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন দলটির নেতারা। আওয়ামী লীগ একটি ছোট্ট ভুল করলেও জনগণের কাছে মনে হয় যেন বিরাট ভুল হয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা যেটি জানা গেছে- মানুষ মনে করেন, আওয়ামী লীগের মত দল ভুল করতে পারে না।
দুই মেয়াদে দীর্ঘ দশ বছর দেশ পরিচালনার পর এবারের নির্বাচনের আমেজটা ছিল অনেকটা ভিন্ন। জনশ্রোত বস্তুতপক্ষে বিরোধী জোটের দিকে দৃশ্যমান হলেও ফলাফল দেখা এর সম্পূর্ণ উল্টো। এবারের নির্বাচনে বিএনপি এবং তাদের মিত্র জোটের ভোটের কৌশল ছিল একটাই। তা হলো-জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করবে। এর মধ্যে প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে রক্তচক্ষু এবং হুমকি-ধমকি দিয়েই তাদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে জয় নিশ্চিত করতে চর্তুমুখি পন্থা বা কৌশল অবলম্বন করে। প্রথম কৌশলে জয়লাভ করে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের চিঠির মধ্য দিয়ে। ড. কামাল হোসেন সংলাপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার পরদিনই তা সুযোগ হিসাবে লুপে নেন শেখ হাসিনা। যথারীতি অনুযায়ী সংলাপ হলো কিন্তু ৭ দফা দাবির ১টি দাবির ফসলও ঘরে তুলতে পারলনা ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু দেশবাসীসহ সারাবিশ্ব দেখলো সরকার সবদলকে নিয়ে নির্বাচন করতে সংলাপ করছে। ফলে শেখ হাসিনার চক অনুযায়ীই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হলো বিএনপি জোট।
আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় জয় আসলো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণায়। এই ইশতেহারে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ উপহার দেওয়ার পাশাপাশি অনেকগুলো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে তরুণ ভোটারসহ পুরো দেশবাসীকে। এর মধ্যে প্রত্যেকটি গ্রামকে শহরে রূপান্তর, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইন্টারনেট ৫-জি’তে উন্নীত করণ, বেকার যুবক-যুবতীদের চাকুরীর ব্যবস্থা করণ, দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স, বিদ্যুতের উন্নয়ন এবং ঘরে ঘরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন, শিক্ষার উন্নয়নসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে দেশবাসীকে একটি রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছে আওয়ামী লীগের ঘোষিত ইশতেহারে।
অন্যদিকে বিএনপির ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথাই বলা হয়েছে ঘুরেফিরে। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধান এবং আইনের সংস্কার এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চার ফুলঝুড়ি ছাড়া তাদের ইশতেহারে আর কিছুই ছিলনা। এতে তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষ আশাহত হয়েছেন। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও বিএনপির ইশতেহারে তাও ছিলনা।
আওয়ামী লীগের তৃতীয় জয়ের কারণ হলো- এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারণায় নানাভাবে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। সমাজের এলিট শ্রেণির লোকজনের সমন্বয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় সব শ্রেণিপেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায়। চলচ্চিত্রাঙ্গন, নাট্যশিল্পী গোষ্ঠি, ক্রীড়াঙ্গনের খেলোয়ার, সাংস্কৃতিক শিল্পীঘোষ্ঠি, জনপ্রিয় ফেসবুকার, ইউটিউবার, ব্লগার, সমাজসেবক থেকে শুরু করে সবশ্রেণির মানুষকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় শামিল করা হয়েছে। এতে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে দলটি। অন্যদিকে সরকারে থাকলেও প্রশাসনযন্ত্রের সাথে নিবিড় যোগাযোগ, নির্বাচনী নানামুখি কৌশল নির্ধারণ, শুরু থেকেই বিরোধী দলকে মাঠে চাপে রাখার কৌশল এবং ভোটের দিন কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে অভাবনীয় ফলাফল ঘরে তুলতে সক্ষম হয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের এতসব রণ কৌশলের কাছে বিএনপি বা তাদের জোটের নির্বাচনে চরম ভরাডুবি হবে এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা তাদের কর্মীদের কেন্দ্র দখলে রাখার নির্দেশ দিলেও ভোটের দিন তাদের কোনো নেতা-কর্মীকে কেন্দ্রের আশেপাশেও দেখা যায়নি।
সর্বশেষ সরকার গঠনেও শেখ হাসিনা বড় চমক দেখিয়েছেন। বয়োজ্যেষ্ঠদের মন্ত্রীত্ব থেকে অবসর দিয়ে নতুনদের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই দিয়েছেন। নতুন মন্ত্রীসভার ২৭ জনই নবীন। তবে বয়সে একেবারে নবীন না হলেও অভিজ্ঞতায় তাঁরা যে নতুন বা নবীন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। নবীন প্রবীণের সমন্বয়ে মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পাওয়া নতুন মন্ত্রীপরিষদ জনআকাঙ্খা পূরণে সফল হবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর। তবে নতুন পরিষদে জোটের কাউকে না রাখা শোভনীয় হয়েছে বলে মনে করিনা। কারণ, রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু মন্ত্রীত্ব বা মন্ত্রণালয় পরিচালনা দক্ষ হিসাবেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করা খুবই অভিজ্ঞতার ব্যাপার বৈকি। তবে কেবিনেটের প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনাই ভালো জানেন তিনি কী কারণে প্রথম দফায় তাঁদের মন্ত্রীসভায় নেননি। হয়তো সংরক্ষিত নারী আসন পূরণ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় আবারো মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ করা হতে পারে। সম্প্রসারণকৃত ওই মন্ত্রীসভায় হয়তো জোটের অনেককেই মন্ত্রীসভায় দেখা যেতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল ধারণা করছেন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিকে সম্পূর্ণ বিরোধী দলে রাখাই যথোপযুক্ত বলে মনে হয়েছে। কারণ, সংসদে কার্যকর একটি বিরোধী দল না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্র বলে কিছু থাকেনা। সরকার বা দেশ পরিচালনায় ভুল করলে বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সংসদে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা, টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া শেখ হাসিনার সরকার কতটা জনআকাঙ্খা পূরণ করতে পারে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ভিন্নমত আরও সংবাদ

রণ কৌশল না জানলে যুদ্ধে জয় করা যায়না

উপকূল মন্ত্রণালয় চাই

আনোয়ার খানের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জার্মান আওয়ামীলীগের হাবিবুর রহমান

উপকূলীয় লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জনমানুষের প্রত্যাশা

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের প্রার্থীদের নিকট তরুণ ভোটারদের চাওয়া গুলো

লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে প্রার্থীদের কাছে ভোটারদের আরো কিছু প্রত্যাশা

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]