সব কিছু
facebook lakshmipur24.com
লক্ষ্মীপুর সোমবার , ৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১০ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি
সংগ্রামে বিজয়ী লক্ষ্মীপুরের জয়িতা তানিয়া চৌধুরী’র সংগ্রামী জীবনের গল্প - Lakshmipur24.com

সংগ্রামে বিজয়ী লক্ষ্মীপুরের জয়িতা তানিয়া চৌধুরী’র সংগ্রামী জীবনের গল্প

সংগ্রামে বিজয়ী লক্ষ্মীপুরের জয়িতা তানিয়া চৌধুরী’র সংগ্রামী জীবনের গল্প

joyeetaনিজস্ব প্রতিনিধি: প্রত্যেক মানুষ তার কর্মের স্বীকৃতি চায়। প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করে সমাজ জীবনে যারা মাথা উচু করে দাঁড়াতে পেরেছে সেই সব নারীকে জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ কর্মসূচীর মাধ্যমে জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য প্রথমেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সেই সাথে মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব জিল্লুর রহমান চৌধুরী যিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচন করে আমাকে সম্মাণিত করেছেন। ধন্যবাদ জানাচ্ছি জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জোবেদা খানম ও আমার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ এন এম আশরাফ উদ্দিনকে যিনি আমাকে ইউনিয়ন পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচন এবং আমার তথ্যাবলী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর,উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করেছেন। এ কৃতজ্ঞতার ভাষা সংগ্রামে বিজয়ী জয়িতা তানিয়া চৌধুরী (আনোয়ারা বেগম)’র। এ বছর তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা হওয়ার গৌরব হন।

তিনি বলেন, গেল ২০ নভেম্বর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২ ব্যাচের রি-ইউনিয়ন হয়ে গেল। বন্ধুদের মিলন মেলায় নিজেকে বড্ড অসফল মনে হয়েছিল। কারণ বন্ধু জামাল সিলেটে বিভাগীয় কমিশনার, কয়েকজন বন্ধু গুরুত্ব¡পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারী। জীবনের পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে হলো আমিই সবার চেয়ে সফল। কারণ ওদের মতো সফল হওয়ার সুযোগ আমার জীবনে ছিলনা। আমার জীবনের গল্প এমন।

জনাব  তানিয়া চৌধুরী এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  সহকারী রেজিস্ট্রার। তার জন্ম  ১৯৫৮ সালে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলাধীন দুর্গম চরাঞ্চল চর ফলকন গ্রামে ।তিনি চর ফলকন গ্রামের  মরহুম মুজাফ্ফার আহমেদ মরহুমা মুজিবা বেগমের মেয়ে।

তাঁর ভাষায়, “জীবনের শৈশব – কৈশর দারিদ্র্য আর সামাজিক বৈষম্যের মাঝে কেটেছে। কষ্টের দিনের কথাগুলো মনে পড়লে শিউরে উঠি। একবেলা খেয়ে বেঁেচ থাকা। কখনো জীবিকার প্রয়োজনে স্বচ্ছল কারো কঠিন কাজে হেল্প করে দেয়া। তেল, সাবান পাউডার তো চোখে দেখিনি।”

তিনি বলেন,“১৯৭০ এর ১২ নভেম্বর স্বরণকালের ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস ও প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড় আমাদের পরিবারে নামে অন্ধকার। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমার পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়। কারণ আমার ভাই জামাল উদ্দিন ও প্রয়াত আবদুল হাদী মাস্টার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।

তাই যুদ্ধের সময় রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী আমাদের বসত ঘর খুলে নিয়ে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পের কাছে লাগিয়েছিল। বাস্তুচ্যুত হয়ে আমাদেরকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে অনেক কষ্টে জীবন যাপন করতে হয়েছে। আমার বাবা পালাতে গিয়ে পিয়ারাপুর পাক বাহীনির হাতে ধরা পড়ে, দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন। ভগ্নিপতিকে গুলি খেয়ে রহমাতখালী খালে ঝাপিয়ে পড়ে ডুব সাতার দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।”

তিনি আরো বলেন,“ ১৯৭২ সনে যুদ্ধ শেষে অটো প্রমোশন নিয়ে হাই স্কুলে ক্লাশ সেভেনে ভর্তি হই। সেই সময়ে আমাদের গ্রামে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো। আমি তখন হাই স্কুলে পড়ি দেখতে শুনতে মোটামুটি ভালই ছিলাম। যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্থতার কারণে এতবেশী দারিদ্রের কবলে পড়েছি যে, বাবা আমাদের পড়া-লেখার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতেন। বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আই.বি.এ তে এম.বি.এ পড়তেন এবং জুট কর্পোরেশনে চাকুরী করতেন। আরো সাতটি মুখ, সাতটি পেট, তাই আব্বা চাইতেন বিয়ে দিতে পারলে সংসারের কিছু খরচ বাঁচবে ”

আমার বিয়ের সকল পাত্রের ঘরে প্রথম স্ত্রী ছিল। ভূ-স্বামী ও জোতদারগণ দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার জন্য আমার পরিবারকে নানা প্রকার প্রলোভন দেখিয়েছিল। কিন্তু আমার মা কিছুতেই রাজী হতেন না। তিনি বলতেন আমার মেয়ে মেধাবী, আমার যত কষ্টই হোক তাঁকে আমি লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করবো। লেখাপড়ার খরচ জোগাবার জন্য আমার মাকে বাঁশ বেতের কাজ, মাটির চুলা বানিয়ে বিক্রি করা থেকে হেন কাজ নেই যা তিনি করেননি। গ্রামের ছেলে মেয়েদের মুট চালের বিনিময়ে আরবী ও বাংলা পড়াতেন। এসব কাজে আমিও মাকে সহযোগিতা করতাম।

হঠাৎ করে এক জোতদারের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ছোট ভাই ড. মোঃ আব্দুল হামিদ (যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) এর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বড় ভাই জামাল উদ্দিনের কাছে চিঠি লিখি আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। যাতে আমি লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে পারি। বড় ভাই বাড়ী আসেন। ঢাকায় যেতে দিতে আব্বা রাজী ছিলেন না। কারণ এ বিয়ে ভেঙ্গে গেলে উনার বিপদ। তাই মা এর সহযোগিতায় বড় ভাই এর সাথে আমি আর আমার ছোট ভাই ড. আবদুল হামিদ খাল সাতরিয়ে হাজির হাট থেকে রাতের বেলায় পাঁয়ে হেঁটে প্রায় ২৬ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্মীপুরে পৌঁছাই। সেখান থেকে বাসে চৌমুহনী যাই। আমার বড় ভাই আমাদেরকে নতুন জুতা, জামা কাপড় কিনে দেয়। শরীর থেকে ভেজা কাপর ছাড়িয়ে দেয়। হাজির হাট থেকে চৌমুহনী পর্যন্ত বাবা ও লাঠিয়াল বাহিনী আমাদেরকে ধাওয়া করেছিল কিন্তু ধরতে পারেনি। তারপর আমরা ঢাকায় পৌঁছি। গ্রামের স্কুল থেকে ঞ.ঈ পাইনি। ঢাকার কোন স্কুলে ভর্তি হতে পারিনি। তাই মতিঝিল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সনে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় বিভাগে এস.এস.সি. পাশ করি। ১৯৭৮ সনে লক্ষ্মীপুর কলেজ থেকে ২য় বিভাগে এইচ.এস.সি পাশ করি। পিতা আমাকে গ্রামে বিয়ে দেয়ার জন্য নানারকম চেস্টা করে। তাই লক্ষ্মীপুর থেকে বড় ভাই জামালের কর্মস্থল চট্রগ্রাম চলে যাই। ১৯৮১ সনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে বি.এ (সম্মান) ও ১৯৮২ সনে সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে এম.এ পাশ করি।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আমার বিয়ে হয়। লক্ষ্মীপুরের মেয়ে চট্টগ্রামের পরিবারের সাথে বসবাস করতে গিয়ে, সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি সব কিছুতে খাপ খাইয়ে নিতে আমাকে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়। পরপর দুটি কন্যা সস্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে আমার উপর অত্যাচারের মাত্রা এত বেশি বেড়ে যায় যে, কন্যাদের সহ আমাকে শ্বশুর বাড়ী থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমার স্বামী সেই অপরাধের কারণে আমাকে কোন পেইন দেননি আবার প্রতিবাদও করেননি। তিনি মেয়েদেরকে অনেক ভালোবাসেন।

পুত্রের আশায় আমি তৃতীয় বার মা হইনি। আমার ছোট মেয়ে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজী (চুয়েট) হতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটি স্ফটওয়ার ফার্মে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করছে। বড় মেয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় চট্টগ্রাম বোর্ড হতে স্ট্যান্ড করেছে। তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজী সাহিত্যে সম্মান সহ, এম.এ ডিগ্রি লাভ করেছে। বর্তমানে একটা ভাল চাকুরী করছে।

আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের আরেকটি সময় আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছি। মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। সেই সময় আমার সাজানো সংসারে ঝড় নেমে আসে। কলেজে পড়ার সময় আমার মেয়ে চবি কলেজ শিক্ষক এর কুনজরে পড়ে। সে লম্পট শিক্ষক আমার মেয়েকে কু প্রস্তাব দিতে থাকে। তার অত্যাচারে আমার মেয়ের শিক্ষা জীবন স্থবির হয়ে যায়। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ চ.বি প্রশাসন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে আমার সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রায় সকল শিক্ষক, মহিলা সমিতির সভানেত্রী ড. হামিদা বানু বলিষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন।

একদিন অফিস থেকে এসে দেখি আমার বড় মেয়ে অনেকগুলো ঘুমের ট্যবলেট খেয়ে আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়ে গিয়েছিল। সাথে একটা চিরকুট তাতে লিখা ছিল “মাগো-এই সমাজের কাছে আমি বেশি কিছু আশা করিনি। চেয়েছি উচ্চ শিক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক হবো। আব্বুর বয়সী স্যার কেন আমায় এত কষ্ট দিচ্ছে।

সেই দিনের সেই কষ্ট আর স্বামীর বাড়ী থেকে বিতাড়ন, ২৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হাঁটা, সকল কষ্টকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সমাজের দুষ্ট ব্যাধি বাল্য বিবাহ মুক্ত দেশে পরিণত হোক আমার দেশটি এই আমার প্রার্থনা। কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে যে, মায়েদের কোন ভূমিকা নেই এই বিষয়টি মিডিয়াতে সরকারী এবং বেসরকারী টেলিভিশনে বিনা খরচে প্রতিদিন প্রচার করা হোক।

বাল্যবিবাহ রোধ করে গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছি বিধায় তোহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রোকেয়া দিবসে আমাকে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। বর্তমানে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত আছি। আমি হয়তো সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হবো। আমার দুঃখিনি মা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন গর্ব বোধ করতেন। আমার আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনে যারা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন, আমার শ্রদ্ধের বড় ভাই জামাল উদ্দীন আহমেদ মেজো ভাই মরহুম আব্দুল হাদী এবং ছোট ভাই ড. আব্দুল হামিদের নিকট ভীষণভাবে ঋণী।

আমার মরহুমা মা মুজিবা বেগম লক্ষ্মীপুরের মেয়ে। আজ তকে খুব মনে পড়ে। তিনি মোটামুটি শিক্ষিত ছিলেন। তাঁর জীবনের করূন আর্তনাদের ইতিহাস নিয়ে তিনি বই আকারে লিখে গেছেন। সেই বইটি ছাপা হয়নি। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেই সময়ে যদি জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ কর্মসুচী থাকতো তা হলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার মা সফল জননী জয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতেন।

জীবনী | ব্যক্তিত্ব আরও সংবাদ

মিসু সাহা’র পিতার ৮ম মৃত্যু বার্ষিকী কাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে লক্ষ্মীপুরের স্কুল শিক্ষক বাবার পাঁচ সন্তান

অতিরিক্ত ডিআইজি হলেন লক্ষ্মীপুরের টুটুল চক্রবর্তী

লক্ষ্মীপুরের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে: ডিআইজি আমেনা বেগম

জজ হলেন লক্ষ্মীপুরের দুই স্কুল শিক্ষকের ছেলে মেয়ে

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ব্যতিক্রম ছিলেন লক্ষ্মীপুরের নুরুল ইসলাম

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ে অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রকাশনার নিবন্ধনের জন্য আবেদনকৃত, তারিখ: 9/12/2015  
 All Rights Reserved : Lakshmipur24 ©2012-2022
Chief Mentor: Rafiqul Islam Montu, Editor & Publisher: Sana Ullah Sanu.
Muktijudda Market (3rd Floor), ChakBazar, Lakshmipur, Bangladesh.
Ph:+8801794 822222, WhatsApp , email: news@lakshmipur24.com