সব কিছু
লক্ষ্মীপুর শুক্রবার , ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৮ই সফর, ১৪৪১ হিজরী

ইলিশে প্রতারণা: লক্ষ্মীপুরে নদীর ঘাটে সাগরের ইলিশ

ইলিশে প্রতারণা: লক্ষ্মীপুরে নদীর ঘাটে সাগরের ইলিশ

গত ২ সপ্তাহ থেকে লক্ষ্মীপুর জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে ইলিশের প্রচুর আমদানি লক্ষ্য করা গেছে। এসব ইলিশের দাম এখনো না কমলেও প্রচুর ইলিশে খুশি ক্রেতা-বিক্রেতারা। ইলিশের ঘাট এবং বাজারগুলো এখন ২৪ ঘন্টা মুখর হয়ে রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার ঘাটে দৈনিক শত মণ ইলিশ মাছ আসছে।

অস্বস্তির কথা হচ্ছে বাজারে প্রচুর ইলিশ আসলেও এ বছর থেকে ইলিশ কিনতে এবং স্বাদ নিতে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। ইলিশঘাট ঘুরে ব্যবসায়ী এবং মাছ ক্রেতাদের মুখে শোনা গেল সে প্রতারণার নানা কথা।

প্রতারণার বিষয়টি হচ্ছে, এ বছর লক্ষ্মীপুরের ঘাটগুলোতে বেশির ভাগ ইলিশ আসছে হাতিয়া, সন্দীপ, ঢালচর,  নিঝুমদ্বীপ, চরফ্যাশন ও ভোলা থেকে। ইলিশ বোঝাই নৌকা হাতিয়া ও তার আশপাশের সমুদ্র এলাকা থেকে নদী পথে লক্ষ্মীপুরের আলেকজান্ডার, রামগতি এবং মতিরহাটে আসতে সময় লাগে  সাড়ে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা।  এতে জেলে এবং ইলিশ ব্যবসায়ীরা বেশি দামে পেলেও ক্রেতারা দামে ও স্বাদে ঠকছেন।

ঘাটের ব্যবসায়ীরা জানান, সাগরের ইলিশ ধরার কমপক্ষে ১৫-২০ দিন পর্যন্ত বরফ যুক্ত হয়ে সাগরেই জেলে নৌকাতে থাকে এবং তা নদীর ইলিশের তুলনায় কম স্বাদ ও গন্ধের। অন্যদিকে মেঘনার ইলিশ টাটকা ও বেশি স্বাদ এবং গন্ধ যু্ক্ত।

সে সুযোগে বিভিন্ন ঘাট এবং হাট-বাজারে এক শ্রেনীর জেলে এবং মাছ ব্যবসায়ীরা সাগরের ইলিশ মেঘনার ইলিশ নামে বিক্রি করে ক্রেতাদেরকে প্রতারিত করে অসাধু উপায়ে বানিজ্য করে যাচ্ছে। তারা দক্ষিন অঞ্চলীয় ও হাতিয়ার ইলিশকে মেঘনার ইলিশ বলে বিক্রি করছে।

সরোজমিনে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছ ঘাটে গিয়ে দেখা  যায়, সেখানে নোঙর করা বেশির ভাগ নৌকাই হাতিয়ার। এরা হাতিয়া ও সন্দ্বিপের সাগর থেকে মাস ব্যাপী মাছ ধরে  ৩০-৪০ কিমি দূরে এসে এ সকল নদী ঘাটে বেশি দামে ইলিশ বিক্রি করছে। দেখা গেছে  এক একটি নৌকায় প্রচুর ইলিশ নিয়ে আসলেও ক্রেতাদের বিশ্বাসের জন্য এক ঝুড়িঁ আধা ঝুঁড়ি করে বিক্রি করছে।

মতিরহাট এলাকার স্কুল শিক্ষক হাসান জানান, ইলিশের অন্যতম জেলা লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ঘাট ও বাজারে এত দিন এক প্রকার ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন  ২ প্রকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। যেটা বেশিরভাগ ক্রেতাদের পক্ষে চেনা সম্ভব না।

ইলিশের দাম প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে মতিরহাটে মাছ ক্রয়রত ঢাকার ব্যবসায়ী মনির জানান, স্বাদ অত্যন্ত ভালো হওয়ার কারণে লক্ষ্মীপুরের মেঘনার ইলিশের দামও বেশি। এক কেজি ওজনের মেঘনার একটি ইলিশ কেজিতে ৮শ-৯শ টাকায় বিক্রি হয়।  সেখানে হাতিয়ার সমুদ্রের ইলিশ প্রতি কেজি ৬শ-৭শ  টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাঝারি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ৪-৫শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, হাতিয়ার সমুদ্রের সে ইলিশ প্রতি কেজি ৩-৪শ।

আগামি অক্টোবর মাস থেকেই ২৪ দিনের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। লক্ষ্মীপুরের  রামগতি থেকে শুরু করে রায়পুরের চরবংশী পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় ২০টি মাছঘাটে জেলেরা মাছ বিক্রি করে। এর মধ্যে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট ঘাটটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং বড়। এঘাটে দৈনিক কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়।

লক্ষ্মীপুর জেলার ইলিশ বিক্রির ঘাট সমূহ হচ্ছেঃ  কমলনগরের মতিরহাটঘাট, তালতলী, বাতিরঘাট, কটরিয়াঘাট, লুধুয়া-ফলকন, রামগতির আদালত ঘাট, রামগতি ঘাট, গাবতলী ঘাট, সেন্ট্রার খাল, টাংকিবাজার ঘাট, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট ঘাট, বুড়িরঘাট এবং রায়পুরের হাজীমারা, নতুন ব্রীজ, পানির ঘাট, বালুর চর, মেঘনার বাজার, পুরান বেড়ী, বেড়িঁর মাথা, হাজিমারা, মেঘনাঘাট।

নদীর ইলিশ বনাম সাগরের ইলিশ

সরকারের মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলছেন, ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধু ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। নদীর ইলিশ একটু বেঁটেখাটো হবে, আর সাগরের ইলিশ হবে সরু ও লম্বা।

সেই সঙ্গে নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ একটু বেশি উজ্জ্বল। নদীর ইলিশ চকচকে বেশি হবে, বেশি রুপালী হবে রং। সাগরের ইলিশ তুলনামূলক কম উজ্জ্বল।”

এছাড়া নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশ মাছের আকার হবে পটলের মতো অর্থাৎ মাথা আর লেজ সরু আর পেটটা মোটা হতে হবে। এক্ষেত্রে লেজের একটু উপর থেকেই মাছটা গোল হতে শুরু করবে।নদী আর সাগরের ইলিশ মাছের আসল পার্থক্য বোঝা যাবে খাওয়ার সময়।

সাগর থেকে ইলিশ যখন ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে, মানে উজানে আসে তখন নদীর যে প্ল্যাংটন বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খায় ইলিশ মাছ তার কারণে তার শরীর বেটে ও মোটা হয়।এই খাবারের কারণেই ইলিশের শরীরে এক ধরণের চর্বি জমে, যা তার আকৃতিকে সাগরের ইলিশের চেয়ে আলাদা করে।

কোন ইলিশ বেশী স্বাদের?

খাদ্য বিষয়ক লেখক ও গবেষক শওকত ওসমান মনে করেন ইলিশের সব ধরণই স্বাদের।

তিনি বলেন, ইলিশ মাছ আকারে যত বড় হবে, তত তার স্বাদ বেশি হয়। আকারে বড় ইলিশকে অনেকে পাকা ইলিশ বলে অভিহিত করে থাকেন।

“সমুদ্র থেকে ইলিশ নদীতে ঢোকার পরে নদীর উজানে মানে স্রোতের বিপরীতে যখন চলে, সেসময় এদের শরীরে ফ্যাট বা চর্বি জমা হয়। এই ফ্যাট বা তেলের জন্যই ইলিশের স্বাদ হয়।”

বর্ষাকালে পাওয়া ইলিশের স্বাদ বেশি হয়। মিঃ ওসমান বলছেন, বর্ষার মাঝামাঝি যখন, ইলশে গুড়ি বৃষ্টি হয়, সেই সময়ে নদীতে পাওয়া ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে বেশি।

এদিকে, মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ড. আনিসুর রহমান বলেন, লোনা পানি ও মিঠা পানিতে বসবাসের কারণেও ইলিশের স্বাদে কিছুটা পার্থক্য হয়। আর সেক্ষেত্রে নদীর ইলিশের স্বাদই বেশি হয়।

এছাড়া ডিম ছাড়ার আগ পর্যন্ত ইলিশের স্বাদ বেশি থাকে। ডিমওয়ালা ইলিশে মাছের পেটি পাতলা হয়ে যায়, এবং চর্বি কমে যায়—এ কারণে স্বাদ কমে যায়।

ডিমওয়ালা ইলিশ আর ডিমছাড়া ইলিশ কিভাবে চিনবেন?

বাজারে ইলিশ সংক্রান্ত যেসব আলাপ প্রচলিত, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিমওয়ালা ইলিশ আর ডিমছাড়া ইলিশ কেমন করে চেনা যাবে?

ড. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে ক্রেতা একটু অভিজ্ঞ না হলে মুশকিল।

তিনি বলেন সাধারণত অগাস্ট মাসের পর থেকে শুরু হয় ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুম, চলবে সেপ্টেম্বর অক্টোবর পর্যন্ত। তবে এখন তো বারোমাস বাজারে ইলিশ পাওয়া যায়।

“ডিমওয়ালা ইলিশের পেটমোটা হবে এবং এটা চ্যাপ্টা হয়ে থাকে।

এছাড়া ডিমওয়ালা ইলিশের পেট টিপলেই মাছের পায়ুর ছিদ্র দিয়ে ডিম বেরিয়ে আসবে। আর ডিম ছাড়া মাছের পেট আলগা বা ঢিলা থাকবে।”

কোন্ ইলিশ কিনবেন না?

ইলিশের খ্যাতি এর স্বাদের জন্যই। ফলে ছোট ইলিশ বা জাটকা কখনোই কেনা উচিত নয়।

কারণ ওগুলোর স্বাদ হয় না।

এছাড়া ইলিশ যদি দীর্ঘদিন কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে এর স্বাদ কমে যায়।

এটা চিনতে হলে খেয়াল রাখতে হবে এই মাছের ঔজ্জ্বল্য কম থাকবে।

এছাড়া একটু নরম মাছ দেখলে বুঝবেন সেটা কয়েকদিন আগের আনা বাসি মাছ।

ইলিশের উপকার

বাংলাদেশের জিডিপিতে এর অবদান এক শতাংশের মত।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী এই মূহুর্তে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে।

ফলে রসনা তৃপ্তির সাথে সাথে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে ইলিশ।

এছাড়া ইলিশ মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী বলে জানান মৎসবিজ্ঞানীরা।

ড. রহমান বলছিলেন “ইলিশ মাছে আছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, পটাশিয়াম। এই মাছ খেলে হৃদযন্ত্র ভালো থাকে, মস্তিষ্কের গঠন ভালো হয়, রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাক, এবং বাত বা আর্থারাইটিস কম হয়। ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারও কম হয়।”

 

এ প্রতিবেদনের শেষ অংশ তৈরির সময় বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনের সাহায্য নেয়া হয়েছে।

 

সদর আরও সংবাদ

লক্ষ্মীপুরের ডেঙ্গু জ্বরে ফার্মেসী ব্যবসায়ীর মৃত্যু, একই বাজারে আক্রান্ত আরো ১৫

লক্ষ্মীপুরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মাঝে বিনামূল্যে ‘ডিজিটাল সাদাছড়ি’ বিতরণ

লক্ষ্মীপুরে মায়ের কাছে ১০ টাকা চাওয়ায় নিজ সন্তানকে গলা টিপে হত্যা

লক্ষ্মীপুরে যুবকের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার

কর্মীরাই বীমা কোম্পানির আসল লোক : লক্ষ্মীপুরে বীমাবিদ জালালুল আজীম

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে গণসংবর্ধনা পেলেন লক্ষ্মীপুর আ’লীগ সভাপতি পিংকু

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৯
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]