সব কিছু
লক্ষ্মীপুর রবিবার , ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৭ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

মেঘনায় ভয়াবহ ভাঙন: আগামি ৩-৪ বছরে বিলীন হতে পারে কমলনগর উপজেলা সদর

মেঘনায় ভয়াবহ ভাঙন: আগামি ৩-৪ বছরে বিলীন হতে পারে কমলনগর উপজেলা সদর

সানা উল্লাহ সানু: লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা জুড়ে মেঘনা নদীর ভাঙন তীব্র ভাবে দেখা দিয়েছে। বর্ষার শুরুতে এ ভাঙন  অতীতের তুলনায় আরো দ্বিগুন হয়েছে। যুগ ‍যুগ ধরে চলে আসা মেঘনা নদীর ভাঙনের ইতিহাস আর অতীত পরিসংখ্যান বলছে, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আগামি ৩ থেকে ৪ বছরে কমলনগর উপজেলা সদর হাজিরহাট বাজারটি  সর্ম্পূণ রুপে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে !

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের সদর ও প্রাচীন রামগতি উপজেলার পশ্চিম সীমানার উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মেঘনা নদী বহমান। ২০০৬ সালে রামগতি উপজেলার উত্তরাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নের ৩১৪.৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয় কমলনগর উপজেলা। কমলনগরের উত্তর-পশ্চিম সীমানা মতিরহাট থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা রামগতির চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুচর গ্রামের জারিরদোনা খাল পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার এলাকা মেঘনা নদী দ্বারা বেষ্টিত।

এ অঞ্চলে যুগযুগ ধরে মেঘনা নদীর ভাঙন চলে আসছিল। তবে ১৯৯০ সাল থেকে নদী ভাঙনের গতি ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ সালের পর থেকে ভাঙন আরো তীব্র গতি লাভ করে তা অদ্যাবধি চলছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে এ উপজেলার শত বছরের সভ্যতাও চিরতরে বিলীন হবে, সাথে সাথে গৃহহীন হয়ে পড়বে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ।

এ উপজেলার একেবারে মাঝখান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক বয়ে গেছে। ইতোপূর্বে যে ক্ষতি হয়ে গেছে তার হিসেব নিতে গিয়ে স্থানীয় অধিবাসীরা লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরকে জানান, ১৯৯০ সালের আগে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা চর কাঁকড়া এবং কোরালিয়ার গড় দূরত্ব ছিল ২৯ কিমি।
বিরতিহীন ভাঙনের ফলে ২০০৬ সালে চর ফলকনের লামচী কৃঞ্চপুর পর্যন্ত সে দূরত্ব এসে দাড়াঁয় ১৯ কিলোমিটারে। এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, কমলনগর উপজেলা গঠনের ১৬ বছর আগেই এ অঞ্চলের ১৭ কিমি দৈর্ঘ্য আর ১০ কিমি প্রস্থের ১৭০ বর্গকিমি এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়ে যায়।

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে উঠে আসে, কমলনগর সময়কালীন ২০০৬ থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে মেঘনা নদীর গড় দূরত্ব এসে দাড়াঁয় ৩ কিলোমিটারে। অর্থাৎ ২০০৬ সাল থেকে ১৩ বছরে পূর্ব দিকে মেঘনা সরে এসেছে আরো ১৪ কিলোমিটার। তবে এরমধ্যে কমলনগর উপজেলা সদর হাজিরহাট বাজার থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব মাত্র ২১শ মিটার।

পরিসংখ্যান থেকে আপাতত এটি পরিষ্কার যে, মেঘনার ভাঙনের বেগ এখন বছরে ১ কিলোমিটার। এ গতিতে মেঘনার ভাঙন চলতে থাকলে আগামি ৩ থেকে ৪ বছরে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়কের যে কোন অংশ নিশ্চিত ভাবে মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে ।

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরের সরেজমিন অনুসন্ধানে এবং নানা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায়, কমলনগর উপজেলার সময়কালীন ২০০৬ থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেঘনায় বিলীন হতে শুরু করেছে উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে চরকালকিনি ইউনিয়নের ৬টি ওর্য়াড পূর্নাঙ্গ বিলীন হয়ে ১, ২ এবং ৩ নং ওর্য়াড মেঘনায় বিলীন হওয়ার পথে। সাহেবেরহাট ইউনিয়নের ৫টি পূর্নাঙ্গ ওর্য়াড শেষ হয়ে, তান্ডব চলছে ৪, ৫, ৭ এবং ৮নং ওর্য়াডে। পাটারিরহাট ইউনিয়নের ১ এবং ৯ নং ওয়ার্ড বিলীন হয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে ২,৭ এবং ৮ নং ওর্য়াডে। চর ফলকন ইউনিয়নের পুরো ৯নং ওয়ার্ড বিলীন হয়ে ৩, ৭ ও ৮ নং ওয়ার্ডে ভাঙন চলছে। নতুন করে চর লরেঞ্চ ইউনিয়নের ৯ নং ওর্য়াড এবং চর মার্টিন ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডে ভাঙন শুরু হয়েছে।

উপজেলা গঠনের সময় কমলনগরের আয়তন ছিল ৩১৪.৮৬ বর্গকিলোমিটার। ক্যালকুলেটরের হিসেবে ভাঙন কবলিত ৬টি ইউনিয়নের ২০৭.৯১ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০.৯৩ বর্গ কিলোমিটার ভূমি সম্পূর্ণ রুপে নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ভাঙন চলছে অন্তত আরো ৬৬ বর্গ কিলোমিটারে। এটি স্পষ্ট যে, গত ১৩ বছরে এ উপজেলার ৪৬.৮২ ভাগ এলাকা মেঘনা নদী দ্বারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানায়, ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের চর কাঁকড়া, কোরালিয়া, লামচি কৃঞ্চপপুর, চর বালুয়া, চর কৃঞ্চপুর, চর মানিকপুর, উড়িরচর, পাতারচর, কটরিয়া, চর মাতব্বর এবং পাতাবুনিয়াসহ ১১টি বড় গ্রাম নদীতে বিলীন হয়েছে।

আবার ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে ঠুয়ারচর, চরজগবন্ধু, পশ্চিম চর ফলকন, গোয়াল মার্কেট, সফিকগঞ্জ বাজার, জনতা বাজার, চৌমুহনী বাজার, সাইয়েদ মুরীরহাট, আজু ব্যাপারীরহাট, তালতলী বাজার, সাহেবেরহাট, কাদির পন্ডিতেরহাট, হাজিগঞ্জ বাজার এবং লুধুয়া বাজারের মতো ১৪টি লোকালয় ও হাট-বাজার বিলীন হয়। একই সময়ে নদী গর্ভে বিলীন হতে দেখা গেছে নাসিরগঞ্জ এবং নবীগঞ্জ বাজারকে। এ সময়ে এ সকল এলাকার সব ধরনের সরকারি বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।

নদীর ভাঙন নিয়ে গবেষণারত সরকারি ট্রাস্ট সিইজিআইএসের তথ্য মতে, গত ১৩ বছরে নদী ভাঙনের ফলে কমলনগর উপজেলার প্রায় ২লাখ ৩০ হাজার অধিবাসীর মধ্যে ৭৩ হাজার অধিবাসী মেঘনা নদীর কারণে বাসস্তুচ্যুত বা বাড়িঘর হারিয়েছে। আরো অন্তত ৬০ হাজার অধিবাসী গৃহ হারানোর শংকায় রয়েছে।

অথচ, টানা ৩৫ বছর তীব্র গতির এ ভাঙনে কোনভাবেই যেন ক্লান্ত হয়নি মেঘনা। ভাঙনে প্রতিনিয়তই বসত-ভিটা হারাচ্ছেন কেউ না কেউ। নদী ভাঙনে গৃহহীন অনেকেই আজ অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকে খোলা আকাশের নিচে, বেড়িবাঁধ ও রাস্তার পাশে বা খাসচর, খাসজমিতে ঠাঁই নিয়ে কোন মতে বেঁচে আছেন। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়কের পাশ এখন মেঘনার ভাঙনের শিকার মানুষের প্রধান আশ্রয় শিবির। সেখানেও ঠিকানা হয় না অনেকের। ভাঙনের শিকার হয়ে এখানকার বহু মানুষ ৭ থেকে ১০ বার ঠিকানা বদল করেছেন। অনেকেই কাজের খোঁজে শহরে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা মেঘনাসহ বাংলাদেশে অন্যান্য নদী ভাঙনের দুটি বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত নদীর ভাঙন ঠেকাতে সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকা এবং দ্বিতীয়ত নদীর তীরবর্তী এলাকায় বালুচর থাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতি বছর যত ভূমি নদীতে বিলীন হয়, তার বেশিরভাগই কৃষি জমি। ক্ষতিগ্রস্থ অর্ধেক মানুষই টাকার অভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারে না। তারা গৃহহীন বা ছিন্নমূল হিসেবে নতুন কষ্টকর বেঁচে থাকার পরিচয় পায়। তাদের কান্না যেনো কেউ শুনছে না। তাহলে নদী ভাঙনের শিকার মানুষ অভিযোগ করবে কার কাছে?

তবুও অভিযোগ থেমে থাকেনি। অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এ এলাকার মানুষ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়, জাতীয় প্রেসক্লাব, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা পরিষদের সামনে, এমনকি নদী পাড়ে তাদের দাবী দাওয়া আদায়ের জন্য প্রতিবাদ, সমাবেশ কিংবা বিক্ষোভ করেছে, স্মারকলিপি দিয়েছে। হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচীও শেষ করেছে নদী সুরক্ষার আশায়।

এলাকাবাসী তাদের দাবী দাওয়া করেই থেমে থাকেনি। নিজেদের উদ্যোগে নানা ছোট ছোট পদক্ষেপ ও নিয়েছে। ২০০৯ সালে তাদের নিজ উদ্যোগে নদীতে ডোলবাধঁ দিয়েছে, জঙ্গলাবাঁধ দেয়ার চেষ্টাও করেছে। ২০১২ সালে নিজেদের উদ্যোগে জিও ব্যাগের ২টি বাধঁও দিয়েছে।

আবার সরকারি উদ্যোগও যে হয়নি তা কিন্ত নয়, ১৯৮৮ সালে মতিরহাট বাজার রক্ষায় ব্লক বাধঁ হয়েছে। একই সময়ে মেঘনা তীরে বিশ্ববেঁড়ি হয়েছে। কিন্তু অবৈজ্ঞানিক এ প্রচেষ্টায় মেঘনাকে থামানো যায়নি।

অবশেষে ২০১৪ সালে সরকারি একটি প্রকল্পের অধীন কমলনগরে ৪০ কোটি টাকা বাজেটের ১কিলোমিটার ব্লক বাধঁ নিমার্ণ হয়। কিন্তু শুরু থেকে এ বাধঁ নির্মাণে দুর্নীতির চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। দুর্নীতির কারণে সে ১ কিলোমিটার বাধঁও এখন নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। অন্যদিকে মেঘনায় আজ পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কোন ড্রেজিং হয়নি। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েই চলছে।

তবুও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ভাঙন প্রতিরোধের নানা পরিকল্পনা আর আশার বাণী শোনা যায়। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়ন, প্রকল্প পাশ, অর্থ বরাদ্দ, অর্থ ছাড় প্রভৃতি নানা ধাপ পেরিয়ে যেতে যেতে ভাঙন আর বসে থাকে না।

এখন এ অঞ্চলের মানুষের বড় প্রশ্ন, যে দেশে বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বড়বড় সেতু আর ফ্লাইওভার হয়, সে দেশের মানচিত্র থেকে আড়াই লাখ অধিবাসী নদীতে বাস্তুচ্যুত হয় কিভাবে?

কিন্ত আমাদের বিশ্বাস কমলনগরের নতুন মাটিতে আবার আসবে ফসলের কাল, আঁধার পেরিয়ে আসবে আগামীর সকাল।

শিল্পী গাইবেনা আর……

মেঘ থম থম করে কেউ নেই.. নেই

জল থৈ থৈ করে কিছু নেই.. নেই

ভাঙনের যে নেই পারাপার

তুমি আমি সব একাকার।

নদী ভাঙ্গন আরও সংবাদ

মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গন কবলিত ৩২ কিমি এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করলেন মেজর মান্নান

মেঘনায় ভয়াবহ ভাঙন: আগামি ৩-৪ বছরে বিলীন হতে পারে কমলনগর উপজেলা সদর

মেঘনার ভাঙ্গন থেকে উপজেলা রক্ষায় কমলনগরে বিক্ষোভ অব্যাহত, সড়ক অবরোধ

নদী ভাঙ্গন ইস্যুতে উত্তাল কমলনগর-রামগতি (ভিডিওসহ)

মেঘনার ভাঙ্গন থেকে রক্ষার দাবিতে কমলনগরে বিক্ষোভ-মিছিল ও সমাবেশ

কমলনগরে মেঘনার তীর রক্ষা বাঁধে ব্যাপক ভাঙ্গন, এলাকাবাসীর মাঝে আতংক

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৯
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]