সব কিছু
লক্ষ্মীপুর সোমবার , ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৪শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

মেঘনায় মাছ নেই, জেলেদের ঈদের কথা কেউ ভাবেনি

মেঘনায় মাছ নেই, জেলেদের ঈদের কথা কেউ ভাবেনি

জুনাইদ আল হাবিব:”অবরোধ শেষ হতে দেখে ৩ লাখ ৮ হাজার টিয়া চালান খাটিয়ে নতুন নাও বানাইছি। নতুন করে গাঙ্গে যামু, বড় বড় ইলিশ ধরমু, কপাল ফিরবে, পোলাপাইন নিয়ে ঈদ করমু। কিন্তু হলো না। পরের দিন থেকে ১১জন জাইল্লা লই গাঙ্গে গেছি। বেকেরে আগেই টিয়া দি আইনতে অইছে। কিন্তু যেইভাবে চালান খাটাইছি, সেভাবে ইলিশ পাইনি। এখন আমাদের পকেট খালি, কীভাবে ঈদ করমু? ” টানা দু’মাস নদীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার দেড় মাস পার হলেও কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ না হওয়ায় এভাবেই হতাশা জানান দিয়ে কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনার জেলে শাহে আলম মাঝি। বয়সটা ৪০এ গিয়ে ঠেকেছে। জেলা সদরের চর রমনী মোহনে বাড়ি।

জেলার কমলনগরের মতিরহাট মেঘনায় ইলিশ ধরেন তিনি। মতিরহাট ইলিশ ঘাটের পাশে মেঘনার কূলে বসেই গল্প হচ্ছিলো তার সাথে। তিনি এও বলছিলেন, “বড় আশা বুক পেতে গাঙ্গে গিয়েছি। কিন্তু যেমন আশা করেছি, তার ধারে-কাছে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারিনি। দুই দিনের খরচ ৯হাজার টিয়া। ইলিশ পাইছি ১৫হালি। বেইচ্ছি ১৫হাজার টিয়া। যদি একদম স্বাভাবিকভাবে গাঙ্গে ইলিশ থাকতো তাহলে নিচে হলেও ৩০হাজার টিয়া কামাই হইতো। অভিযানের টাইমে গাঙ্গে নামিনি। আঁর জাইল্লার কার্ড আছে। অভিযানে আঁই চাল পাইছি। কিন্তু ৪০কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও এবার চাল পেয়েছি মাত্র ২৮কেজি। এ চাল দিয়ে কী সংসার চলে?”

একই চিত্র চাঁদপুরের মেঘনায়। অভিযানের কয়েক দিন শেষ হতে চললেও মিলছে না ইলিশের দেখা। দ্বীপ হাইমচর ও চর ভৈরবী মেঘনাতীর ঘুরে এমনটিই তথ্য পাওয়া যায়। জেলা ব্র্যান্ডিং সূত্র মতে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। কিন্তু এখানে মেঘনার এপার-ওপার ঘুরে ইলিশের খোঁজ মিলেনি। ইলিশের আকাল চিত্রের দেখা মিলে হাইমচরের চর ভৈরবী মাছঘাটে গিয়ে। আড়ৎ ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, অভিযানের সময়েও চুপচাপে ইলিশ শিকার হয়েছে। তাই নদীতে ইলিশ নেই। এক জনের দেখাদেখিতে অন্যজনও ইলিশ শিকারে উৎসাহ পেয়েছে। মেঘনায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরার সাথে মেঘনাপাড়ের বহু মানুষের জীবন-জীবিকার স্রোত বয়ে চলে। এ সখ্যতায় বিবর্ণ রূপ দেখা দেয় নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে অথবা ইলিশের দেখা না মিললে। মেঘনার জেলে ও মেঘনাপাড়ের মৎস্য ব্যবসায়ী, বরফ কারখানার মালিক-শ্রমিক, স্থানীয় দোকান- পাটের ব্যবসায়ীদের জীবিকা কেবল নদীর ওপরই নির্ভর। মো. মিলন। বয়স ৩৫বছর। ২ছেলে ও ১মেয়ে সংসার তার। মেঘনাপাড়েই চা’য়ের দোকান তার।

এতেই জীবন বাঁচে। বড় ছেলে জিহাদকে পড়ান ৩য় শ্রেণিতে। তিনি বলছিলেন, “নদীর জেলেদের আয় থাকলে আমাদের আয়। কারণ নদীতে গিয়ে তারা যদি মাছ না পায়, তাহলে দোকানের বেচাকেনাও বন্ধ। আর বেচাকেনা না হলে আমাদের আয়-রোজগারও হবে না। এতে আমরাও ইচ্ছে করলে ঈদে আনন্দ- ফুর্টি করতে পারি না। এজন্য আমরাও বলতে গেলে নদীতে মাছ পাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। তা ছাড়া জেলেদের বাকি দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও সম্ভব না।” মতিরহাট ইলিশ ঘাটে বসে কথাচলছিলো আরেকজন জেলে আনোয়ার আলী সরদারের সাথে। বয়স ৭০বছরে দাঁড়িয়েছে। এ ভারেই শরীর অনেকটা ন্যূয়ে পড়েছে। চর কালকিনি ইউনিয়নের জেলে তিনি। খুব আক্ষেপেই বললেন, “ধার-দেনা, ঋণের বোঝা, দোকানে বাকি খাই জীবন কাটাইছি। নদীর কামাইতেই জীবন চলে। আঁই প্রকৃত জাইল্লা হলেও নিবন্ধন কার্ড পাইনি।

সরকার বরাদ্দ দিলেও আমরা পাইনা, আমরা পামুনা।” তার সাথে সূর মিলিয়ে একই অভিযোগ জানালেন একই ইউনিয়নের জেলে বাবুল মাঝি। বয়স ৪৮এর কোঠায়। তিনি জানান, “অভিযানে গাঙ্গেও যাইনি, কামাইও করতে পারিনি। কিন্তু আমারে কেউ একটা কার্ডও দিলনা।” পূর্ব চর রমনী মোহনের আরেক জেলে নাছির মাঝি। তার বয়স এখন ৪৫বছর। কার্ড থাকলেও চাল বিতরণ নিয়ে অভিযোগের তীর ছোড়েন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ৪০কেজি চাইলের জায়গায় আঁরে ৩০কেজি চাল দিছে। এটা যেন খয়রাত দিছে। সরকার আঙ্গোল্লাই চাইল দিলেও আমরা পাইনা। যারা নদী চিনেনা, কখনো নদীতে মাছ ধরতে যাইনি, তারা জাইল্লার কার্ড পায়।”

২৮বছর বয়সি কালাম মাঝি নামের আরেক জেলের অভিযোগটাও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলছিলেন, “কেউ কেউ অভিযানের সময়ে বিনা বাঁধায় ইলিশ ধরে। তারা ধরতে পারলে আমরা পারবো না? কার্ড না থাকায় অভিযানে নদীতে পেটের টানে গিয়েছি। এতে নির্যাতিত হয়েছি, জাল পুড়িয়ে ফেলেছে, নৌকা এখনোও আটকানো। দেখেন, জেলের কার্ড জেলে না পেয়ে কৃষক ও অন্যান্য পেশার লোক পায়। অথচ মাত্র ৪০%জেলে কার্ড পায়, বাকিরা পায়না। যারা কার্ড পায়না, তারা কিভাবে বাঁচে? তা কেউ দেখেনা। শুধু আমরা কেন অভিযানে নদীতে যাই, সেজন্য আমাদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়। নদীতে না গেলে খামু কী করে? অন্য কোন কাজতো করতে পারিনা। বাচ্চা-কাচ্ছারা কী না খেয়ে মরবে? ঈদতো দূরের কথা। আগে আমাগোরে ঠিকমতো পেটে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তারপর যদি আমরা সরকারের কথা না শুনি, তাহলে উপযুক্ত শাস্তি দিলে আমাগো কিছু বলার থাকবেনা।” মতিরহাট ইলিশ ঘাটের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মেহেদী হাসান লিটন বলছিলেন, ১লা মার্চ থেকে ৩০এপ্রিল পর্যন্ত দু’মাস নদীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশ ব্যবসা তেমন লাভজনক হয়ে ওঠেনি।

তবে আশা করেছিলাম অভিযান শেষ হলে হয়তো ইলিশ পাওয়া যাবে। কিন্তু অভিযান শেষ হয়ে দেড় মাস পার হতে চললেও নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় সবার মাঝে হতাশা। তাছাড়া অভিযান চলাকালীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত কার্ডের সংখ্যা এ অঞ্চলে কম। যার জন্য এখানের বহু জেলেই অভিযানের সময় মানবেতর জীবন পার করে। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় ঈদ উপলক্ষ্যে জেলে ও নদীতে জীবিকা নির্ভর মানুষের জন্য কোন বরাদ্দও নেই। এতে নদীতে গিয়ে ইলিশ না পেলে ঈদের আনন্দ আরোও মাটিতে মিশে।” এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মুহিবুল্লাহ’র সাথে আলাপ হলে তিনি বলছিলেন, “এ সময়ে নদীতে একটু ইলিশ কম থাকে। তবে আগস্টের দিকে প্রচুর ইলিশ জালে পড়তে পারে। এখন নদীতে পোনা আছে। এজন্য জেলেদের কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ হয় না।” ঈদ কেন্দ্রিক জেলে সম্প্রদায়ের জন্য কোন বাজেট আছে কী জানতে চাইলে তিনি আরো বলছিলেন, “অভিযান চলাকালে কিছু বরাদ্দ আসে। তবে সেটা অতটা না, যে সকল জেলে পাবে। আর ঈদ উপলক্ষ্যে জেলেদের জন্য কোন বাজেট নেই।

লক্ষ্মীপুর সংবাদ আরও সংবাদ

লক্ষ্মীপুরে পরিত্যক্ত ইটভাটা থেকে গুলিবিদ্ধ যুবকের লাশ উদ্ধার

ইলিশে প্রতারণা: লক্ষ্মীপুরে নদীর ঘাটে সাগরের ইলিশ

কমলনগরে মেঘনায় ভয়াবহ ভাঙন : এক রাতেই ৩শ মি বাঁধসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন

লক্ষ্মীপুরে নতুন আরেকটি লঞ্চঘাটের অনুমোদন

আন্ত:স্কুল ফুটবলে লক্ষ্মীপুর জেলা চ্যাম্পিয়ন তোরাবগঞ্জ

লক্ষ্মীপুরে ৪৮তম জাতীয় স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জেলা ফাইনাল সোমবার

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১২ - ২০১৯
সম্পাদক ও প্রকাশক: সানা উল্লাহ সানু
রতন প্লাজা (৩য় তলা) , চক বাজার, লক্ষ্মীপুর-৩৭০০
ফোন: ০১৭৯৪-৮২২২২২,ইমেইল: [email protected]