সব কিছু
facebook lakshmipur24.com
লক্ষ্মীপুর শুক্রবার , ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি
নাভানা কনস্ট্রাকশনের গাফিলতি: লক্ষ্মীপুরে ১৬০ কোটি টাকার সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ অনিশ্চিত

নাভানা কনস্ট্রাকশনের গাফিলতি: লক্ষ্মীপুরে ১৬০ কোটি টাকার সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ অনিশ্চিত

নাভানা কনস্ট্রাকশনের গাফিলতি: লক্ষ্মীপুরে ১৬০ কোটি টাকার সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ অনিশ্চিত

সানা উল্লাহ সানু: বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ সহায়তায় প্রায় ১৬০ কোটি (১শ ৫৯ কোটি ৮৯ লাখ ৯৬ হাজার) টাকা ব্যয়ে মাল্টিপারপাস ডিজেস্টার শেল্টার প্রজেক্ট (এমডিএসপি) এর আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলার ৩৪টি সাইক্লোন সেল্টার কাম স্কুল ভবন নির্মাণ কাজ শেষ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা। ২ বছরের এ প্রকল্পে ৪ বছর পর কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৪৮ ভাগ। কিন্ত মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে বেশির ভাগ নির্মাণাধীন ভবনের কাজ হয়েছে ২০-২৫ ভাগ। কোনটির কাজ গ্রেট বীমের পর পিলারেই শেষ।
অন্যদিকে সেল্টার কাম স্কুল নির্মাণের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ক্লাশ চালানোর চিন্তায় রয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা প্রশাসনসহ প্রশাসনের কেউই জানাতে পারছেন না কবে নাগাদ নতুন ভবন পাওয়া যাবে।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা এবং স্কুলের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নের গাইয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রামের একমাত্র বিদ্যালয়টিতে ছিল টিনশেডের ঝরাজীর্ণ ভবন। ছয় মাসের ভেতর তিনতলা নতুন ভবন তৈরি শেষ হবে এমন আশায় টিনশেড ভবনটি ভেঙ্গে খালি করে দেয়া হয়েছিল নতুন ভবন তৈরির জন্য। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভবন তৈরির কাজও শুরু হয়। গ্রেটবীমের পর পিলার উঠানোর পর কাজ বন্ধ। কিন্ত এরমাঝে চার বছরের বেশি সময় পরেও সে ভবনের পিলার ছাড়া আর কিছুই হয়নি। লকডাউনের পর বিদ্যালয় খুলে দিলে ছাত্রছাত্রীরা কোথায় বসে ক্লাশ করবে ? সে চিন্তায় অস্থির প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন এমন তথ্য।
প্রধান শিক্ষক মনোজ চন্দ্র দাস ক্ষোভে নিয়ে জানান, ঠিকাদার তাদের মালামাল সরিয়ে আমাদের জায়গায় খালি করে যেন দেয়। নতুন ভবন দরকার নেই। লকডাউনের পর স্কুল খুললে ছাত্রছাত্রীরা কোথায় পড়বে? বসতে না পারলে ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসবে না। তিনি আরো জানান, স্কুলের ভবন নির্মাণের এ অবস্থা নিয়ে তিনি উপজেলা এবং জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রশাসনকে একাধিকবার অভিহিত করেছেন কিন্ত কোন কাজই হচ্ছে না।

নির্মাণাধীন ভবনের তথ্যবোর্ড থেকে জানা যায়, ৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে গাইয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ত্রিতল পাকা ভবন নির্মাণ শুরু করে নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি ছিল নির্মাণ শেষ করে ২৪ মাসের ভেতর পাকা ভবন হস্তান্তর করবে। কিন্ত কাজ শুরুর ৩ বছর ১০ মাস পরেও ভবনের খুঁটি আর গ্রেটবীম ছাড়া আর কিছুই হয়নি। কবে নাগাত ভবন নির্মাণ শেষ হবে তাও জানে না কেউ। প্রকল্পের ২৫ নং সিরিয়ালের এ স্কুল ভবনটির কাজ ২৮ ভাগ শেষ হয়েছে বলে তথ্যবোর্ডে দেখানো হয়েছে।

এ প্রকল্পের অধীন কমলনগর উপজেলার কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের চর পাগলা পাটওয়ারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। তিনছাদের ভবনের বিদ্যালয়টির প্রথম ছাদ ঢালাইয়ের জন্য রডের যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছে তা গত ২৭ মাস যাবত বৃষ্টিতে ভিজে রোদে শুকাচ্ছে। ছাদের জন্য গাথাঁ সবগুলো রডই মরিচা ধরে পুরো লাল হয়ে গেছে। আবার প্রথম ছাদ থেকে ২য় ছাদের পিলারের জন্য রাখা রডগুলো শক্ত মরিচায় আবৃত। হাত লাগলেই মরিচা ভেঙ্গে হাতে চলে আসে। স্থানীয়রা জানায়, সাড়ে তিন বছর আগে পিলারের এ রডগুলো গাথাঁ হয়। মাঠেও মরিচায় লাল হওয়া কিছু রড এবং সামান্য কিছু পাথর পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

নির্মাণাধীন বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার মফিজুল উল্লাহ জানান, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ না করেই বিল উত্তোলনের পায়তারা করছে। তিনি আরো জানান, ভবনটি নির্মাণকালীন সময়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার জন্য যে অস্থায়ী টিনশেড ঘর তৈরি করা হয়েছে তাও ভেঙ্গে গেছে। ভবিষ্যতে ছাত্রছাত্রীরা কোথায় লেখাপড়া করবে তা নিয়ে দু:চিন্তায় তিনি।

৪ কোটি ২৩ লাখ টাকায় ব্যয়ে ত্রিতল এ বিদ্যালয় ভবনটি ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল তারিখে নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেছিলেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন। কাজ উদ্বোধনের পর থেকে প্রায় চার বছর পার হয়েছে। তবে একটি ছাদও নির্মাণ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার। প্রকল্পের ২৩ নং সিরিয়ালের এ স্কুল ভবনটির কাজ ৪০ ভাগ শেষ হয়েছে বলে তথ্যবোর্ডে দেখানো হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)’র লক্ষ্মীপুর অফিস ও প্রকল্পের প্রসপেকটাস সূত্রে জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ (আইডিএ-ক্রেডিট নং ৫৫৬১ বিডি) সহায়তায় মাল্টিপারপাস ডিজেস্টার শেল্টার প্রজেক্ট (এমডিএসপি) এর আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলায় ৩৪টি সাইক্লোন সেল্টার কাম স্কুল ভবন এবং ২০.৪৫ কিলোমিটার রাস্তা ও ২২টি কালভার্ট নির্মাণের কার্যাদেশ পায় নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।

১শ ৫৯ কোটি ৮৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি প্যাকেজে (এলজিইডি/এমডিএসপি/এলএকে/১৪-১৫/এনডব্লিউ-৬) ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর কাজ শুরু করে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর মাসের ভেতর কাজ হস্তান্তর করবে বলে চুক্তি হয়। কাজের তদারকি করা দায়িত্ব দেয়া হয় স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরকে।

প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ৭টি, রামগতিতে ১০টি, কমলনগরে ৬টি, রায়পুরে ৮টি এবং রামগঞ্জ উপজেলায় ৩টি সাইক্লোন সেল্টার কাম স্কুল ভবন ও কানেক্টিং সড়ক, কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। কিন্ত প্রায় চার বছর পর চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সেল্টারের নির্মাণ কাজও শেষ করতে পারেনি নাভানা কনস্ট্রাকশন। কবে নাগাদ শেষ হবে তাও জানে না কেউ।

মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ভবনের পিলার এবং একতলায় নির্মাণ কাজ সীমাবদ্ধ। প্রকল্পের সদর উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব ভবানীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাসমহল শাকচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য শাহচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইটের কাজ আংশিক শেষ হয়েছে। বাকি ৩১টি স্কুল ভবনের কাজ, একতলার গ্রেটবীম, ছাদ,পিলারেই সীমাবদ্ধ। তবে লক্ষ্মীপুর এলজিইডি অফিসের তথ্যবোর্ডে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত উক্ত প্রকল্পের পৃথকভাবে ২৮-৬০ ভাগ এবং গড়ে ৪৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে তথ্য দেখানো হয়। অবশিষ্ট কাজ কখন শেষ হবে তার সুনিদির্ষ্ট কোন তথ্য জানে না, এলজিইডির জেলা অফিসের কর্মকর্তারাও।

কমলনগরের তোরাবগঞ্জ গ্রামের যুবক হাসান মাহমুদ মিশু জানান, ঠিকাদার নিজেদের ইচ্ছে মতো যা খুশি তাই করছে। তাদের কে কেউ তদারকি করছে না। বিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কমলনগরের তোরাবগঞ্জ গ্রামের মো: ইউছুফ জানান, ঠিকাদার তার ইচ্ছে মতো ফাইলিংসহ নিচের কাজ করছিল। ঠিকাদাররা কারোই কোন কথা শুনেননি। তবুও চার বছরেও একটি ভবন নিমার্ণ শেষ করা যায়নি। তিনি আরো জানান, কমলনগর উপজেলার প্রায় সবগুলো বিদ্যালয়ের একই অবস্থা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে, নাভানা কনস্ট্রাকশনের একজন প্রকৌশলী জানান, কাজের শুরু থেকেই রড, সিমেন্ট, বালু, পাথরের টানাটানি ছিল। এত সংকটে বড় প্রকল্পের কাজ করা যায় না। তিনি আরো জানায়, সে কারণে উক্ত প্রকল্প থেকে বহু প্রকৌশলী চাকুরী ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বর্তমানে যারা রয়েছে তাদেরও অনেকের বেতন ভাতা নেই ৩-৪ মাস। কি কারণে কাজে এ গাফিলতি তাও বলতে পারছেন না তিনি। তিনি আরো জানান, প্রকল্পের শুরুতে ৩৪টি ভবনের জন্য প্রায় ৩শ জনবল ছিল। বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১শ জন। তবে বেশির ভাগেরই বেতন নেই বহু দিন। রায়পুর উপজেলার গাইয়ারচর গ্রামের শ্রমিক সিদাম মজুমদার জানান, মাসে ৭ হাজার টাকায় একটি সাইটের শ্রমিক তিনি। গত ৪ মাস যাবত তার বেতন নেই।

এ বিষয়ে জানতে প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী এএইচএম মাহবুবুর রহমানের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি সাংবাদিকের পরিচয় জানার পর তিনি উক্ত প্রকল্প নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে আরো ১০-১২ বার ফোন করলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আরো একাধিক কর্মকর্তারা সাথে কথা বলতে চাইলে কেউই কথা বলতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ আলম পাটওয়ারী বলেন, নাভানার সাথে লক্ষ্মীপুর জেলার প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করার জন্য আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এপ্রিল মাসে লিখিত ভাবে জানিয়েছি। তিনি আরো জানান, কাজের এমন হ-য-ব-র-ল আগে আর কোথাও দেখিনি। বাজেট সীমার কারণে আমাদের অফিসের মাধ্যমে এ কাজের টেন্ডার হয়নি। সে কারণে আমরা পুরো তদারকি করতে পারিনা। অন্যদিকে নাভানা কনস্ট্রাকশন আমাদের কোন কর্মকর্তার সাথেও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে না বলেও জানান তিনি। এ অবস্থায় প্রকল্প শেষ হওয়া ও মান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে দাবি তার।

সংবাদটি আগে প্রকাশিত হয়েছে, ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যার্ন্ডাড এর ২৪ জুলাই তারিখের প্রতিবেদনে

সমস্যা | প্রত্যাশা আরও সংবাদ

মেঘনার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবিতে রামগতিতে মানববন্ধন

রায়পুরে ১ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার তিন বছরেও শেষ হয়নি

নাভানা কনস্ট্রাকশনের গাফিলতি: লক্ষ্মীপুরে ১৬০ কোটি টাকার সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ অনিশ্চিত

চিকিৎসক ও জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে রামগতির স্বাস্থ্য সেবা

লক্ষ্মীপুরে বাস শ্রমিকদের মানবেতর জীবন; গণ পরিবহন চালুর দাবিতে বিক্ষোভ

তিন দিন যাবত লক্ষ্মীপুর ফেরিঘাটে মালবাহী গাড়ির দীর্ঘজট

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ে অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রকাশনার নিবন্ধনের জন্য আবেদনকৃত, তারিখ: 9/12/2015  
 All Rights Reserved : Lakshmipur24 ©2012-2021
Chief Mentor: Rafiqul Islam Montu, Editor & Publisher: Sana Ullah Sanu.
Sopna Monjil (Ground Floor), Goni Headmaster Road, Lakshmipur, Bangladesh.
Ph:+8801794 822222, WhatsApp , email: news@lakshmipur24.com