“আমাদের-নদী”:যাদের পাড়ে গড়েছে লক্ষ্মীপুরের বিচিত্র সভ্যতা

march-for-river-dakatiaসানা উল্লাহ সানু:: আচঁলে মেঘনার মায়া ডাকাতিয়ার বুকে/ রহমত খালি নদী বয়ে চলে মৃদু একেঁ বেঁকে /নারিকেল সুপারি আর ধানে ভরপুর/ আমাদের আবাস ভুমি প্রিয় লক্ষ্মীপুর । বিখ্যাত এই কবিতার মাধ্যমে সহজেই আমাদের নদী অধ্যুষিত জেলার বিবরণ পাওয়া যায়। কারণ নদী কিংবা জলপ্রবাহকে কেন্দ্র করেই মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর বুকে সকল সভ্যতার প্রাণ হচ্ছে নদী। নদী কিংবা সমুদ্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে মানব সভ্যতার বিকাশ।
অথচ লক্ষ্মীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী সেই নদী গুলো আজ আর ঐতিহ্যের কাতারে নেই। নানাবিদ দূষণ, দখল আর বালু উত্তোলনের কারণে জেলার নদীগুলো যেন জেলাবাসীর জন্য্ আজ অভিশাপের কাতারে। তাই বিশ্ব নদী দিবসে জেলার নদ-নদী আর খালের নানা দিক নিয়ে লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকমের নদী বিষয়ক বিশেষ ক্রোড়পত্র “আমাদের-নদী” সাজিয়েছেন সানা উল্লাহ সানু ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন মিরাজুর রহমান পাটোয়ারী

এবারের নদী দিবস ও প্রেক্ষাপট: দখল ও দূষণের হাত থেকে নদীর মুক্তির দাবিতে রোববার বিশ্ব নদী দিবস-২০১৪ পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হল, “নদীর তীর ফিরিয়ে দাও”। এ উপলক্ষ্যে শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সামনে আয়োজিত মানব বন্ধনে দেশের পরিবেশবাদী ৩৬টি সংগঠনের সাথে একাত্মতা ঘো্ষনা করে বক্তব্য রাখেন, লক্ষ্মীপুরের ডাকাতিয়া সুরক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে ডাকাতিয়া নদীর সুরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহবান জানান।

দিবসের ইতিহাস:
নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে জনমত গড়তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘বিশ্ব নদী দিবস’ পালিত হয়। কানাডার নদী সংরক্ষণ কর্মী ড. মার্ক অ্যাঞ্জেলো নদী দিবসের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮০ সালে নদী দিবসের দাবি জানান তিনি। পরে জাতিসংঘ ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার ‘বিশ্ব নদী দিবস’ ঘোষণা করে। গত বছর বিশ্বের ৭০টি দেশে দিবসটি পালিত হয়

লক্ষ্মীপুরের সভ্যতা গড়ার পিছনে মেঘনা নদী:

মেঘনা নদী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম নদী এবং পৃথিবীর বৃহৎ নদীগুলোর অন্যতম। কমলনগর , রামগতি এবং রায়পুরের বেশির ভাগ লোকেরই আয়ের বড় একটি অংশ হচ্ছে মেঘনায় আহরিত মাছ । পূর্ব ভারতের পাহাড় থেকে উদ্ভূত মেঘনা নদী বাংলাদেশের সিলেট থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছতে মোট ৬৭০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়েছে। মেঘনা হিমালয় বলয় বর্হিভুত নদী যা দুটি অংশে বিভক্ত। কুলিয়ারচর থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত অপার মেঘনা। নদীর এই অপেক্ষাকৃত ছোট। ষাটনল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত অংশ লোয়ার মেঘনা নামে পরিচিত। এই অংশ বিশাল নদী এবং পৃথিবীর বৃহত্তম মোহনার অধিকারী। ষাটনলের কাছে পূর্বদিক থেকে আসা মেঘনার পানি স্বচ্ছ ও নীল আর পশ্চিম থেকে প্রবাহিত ধলেশ্বরীর পানি ঘোলা, কেউ কারও সঙ্গে না মিশেই কিমি পর কিমি প্রবাহিত হয়েছে।
ষাটনলের ১৬ কিমি ভাটিতে চাদঁপুরের কাছে গঙ্গা-পদ্মা-যমুনার মিলিত পদ্মা নামে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশাল আকৃতি ধারণ করে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। মিলিত স্থলের ভাটির অংশের নাম লোয়ার মেঘনা। এর বিস্তৃতি ১১কিমি এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ কিমি। লোয়ার মেঘনায় প্রচুর চর গঠিত হয়েছে। মেঘনার তিনটি ধারা হচ্ছে-ইলিশা বা তেতুঁলিয়া,শাহাবাজপুর এবং বামনী। ছয় কিমি তেতুঁলিয়া ভোলাকে বরিশালের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। অন্যদিকে আট কিমি দৈর্ঘ্যের শাহাবাজপুর ভোলাকে রামগতি এবং হাতিয়া দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। বর্তমানে বামনীর অস্তিত্ব নেই। মেঘনা অত্যন্ত গভীর এবং নাব্য একটি নদী। সারা বছরই এ নদীতে অসংখ্য নৌযান চলাচল করে। ইলিশ এই নদীর প্রধান মাছ। দেশের নদীতে যত ইলিশ পাওয়া যায় তার শতকরা ৮০ভাগই মেঘনার ইলিশ। আবার মেঘনার ইলিশের বিখ্যাত অংশের নাম লক্ষ্মীপুরের রামগতি আর কমলনগর। ইলিশ ছাড়াও শতশত প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এই নদীতে পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি চাষের জন্য একমাত্র প্রাকৃতিক রেণু পোণা পাওয়ার ও একমাত্র ভাল ক্ষেত্র মেঘনা বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি আর কমলনগর অঞ্চল। আবার মেঘনার বুকে ভেসে আসা বালু উত্তোলন করেও নিমার্ণ শিল্পে বিশেষ ভুমিকা রাখছে মেঘনা। এই নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট যেমন রামগতির আলেকজান্ডার,কমলনগরের মতিরহাটে স্টীমার ঘাট এবং লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাটে ফেরিঘাট আছে। এই নদীর পানি বিভিন্ন খালে নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে হাজার হাজার একর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। চাদঁপুরের ষাটনল,ভোলার দৌলতখান,তজুমুদ্দিনে মেঘনার পানি সংগ্রহ করে লবণাক্ততা নির্ণয় করা হয়। ইলিশ, যাতায়াত কিংবা কৃষি ক্ষেত্রে চাষাবাদ এত কিছুর পরও এই মেঘনাই রামগতি আর কমলনগরের হাজার হাজার একর ভুমি নিজ মুখে গ্রাস করেছে। এতে করে কয়েক হাজার মানুষ ভিটে হারিয়ে পথে বসেছে।

ডাকাতিয়া নদী:
ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য-২শ ৭ কিলোমিটার। বাংলাদেশের কুমিল্লা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদী। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা-লাকসাম চাঁদপুর হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। যা লক্ষ্মীপুরের হাজিমারা পর্যন্ত বিস্তৃত। চাঁদপুর থেকে এই ডাকাতিয়া নদী যোগ হয়েছে কুমিল্লার গোমতীর সঙ্গে ইহা ২৩.২০ অক্ষাংশে এবং ৯১.৩১ দ্রাঘিমায় বিস্তৃত। যা বামদিকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে মিশেছে। মেঘনা নোয়াখালীতে প্রবেশের পর ডাকাতিয়া নাম ধারণ করেছে।

“ডাকাতিয়া” নদীকে ঘিরেই রায়পুরের কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ।আজকের রায়পুর যে কারণে বিখ্যাত,ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এতো গুরুত্বপূর্ণ- তার প্রধানতম কারণ হচ্ছে ডাকাতিয়া।ডাকাতিয়া-কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এশিয়ার বৃহত্তম রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।প্রতি বছর এখানে অবমুক্ত করা হত লক্ষ লক্ষ রেনু-পোনা,যা মুক্ত জলাশয়ে মাছের চাহিদা পূরণ করত। সেই সাথে জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল রায়পুরের বিশাল জেলে পল্লীর মানুষগুলোর।আজ তারা তাদের ঐতিহ্যের পেশা ছেড়ে দিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে বিভিন্ন পেশায় অভ্যস্ত করছে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে।
আজ সেই ডাকাতিয়া মৃতপ্রায়,অচল। ডাকাতিয়া পাড়ের মানুষদের দখল এবং অব্যাহত দূষনের ফলে তার অস্তিত্ব বিলীনের পথে,সেই সাথে বিলুপ্ত এর জলজ প্রাণী,বিশেষ করে এর নানান প্রজাতির সু-স্বাদু মিঠা পানির মাছ।ডাকাতিয়ায় এক সময় সেই সুদুর ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে পণ্য পরিবহন করা হত।ছিল যাত্রীবাহী লঞ্চ ঘাট।আর আজ…ডাকাতিয়া শুধুই পৌরবাসীর বর্জ্যের বাগাড়।হারিয়ে ফেলেছে তার স্রোত,স্বচ্ছ পানির কল কল ধ্বনি,আজ আর শুনা যায় না মাঝি-মাল্লাদের ভাটিয়ারী গানের সুর..দেখা হয় না দাঁড় বয়ে চলা কিংবা রঙ্গিন পাল তোলা নৌকা।নদী তীরের বিশুদ্ধ বাতাস আজ রীতিমতো দূ:স্বপ্ন…!বিটকুটে দূগন্ধে আজ নাক চেপে হাটতে হয় নদীর পাড়ে।কত মানুষের শৈশব কাটতো যে নদীতে ঘন্টার পর ঘন্টা সাতরিয়ে…আর আজ সেই নদীর পানি সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী…দুই তীরে দখল তো চলছেই…স্বার্থপর মানুষদের লোভাতুর দৃষ্টি দিন দিন যেন বেড়েই চলছে…
অন্যদিকে আমাদের পাশের জেলা চাঁদপুর শহরবাসীর বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস হচ্ছে ডাকাতিয়া নদী। বৃটিশ আমলে চাঁদপুর রেলস্টেশন, রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা-বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য বড়স্টেশন ও ৩নং ঘাট এলাকায় পানি শোধণাগার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ডাকাতিয়া নদী থেকে পাইপ দিয়ে মটরের সাহায্যে সু-উচ্চ ট্যাঙ্ক বা জলাধারে উঠানোর পর বিশুদ্ধ করে রেলওয়ে এলাকায় সরবরাহ করা হতো। চাঁদপুর পৌরবাসীর সিংহভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয় ডাকাতিয়া নদী থেকে উত্তোলন করে নতুনবাজার ও পুরাণবাজার পানি শোধণাগার কেন্দ্রের মাধ্যমে।
চাঁদপুর শহরের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একের পর এক শিল্প কারখানার বিষাক্ত পানি ও বর্জ্য ডাকাতিয় নদীতে ফেলা হয়। চাঁদপুর শহরের অধিকাংশ ড্রেনের ময়লা বিষাক্ত পানি ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে পড়ে। বর্ষাকালে পানি বৃদ্ধি ও স্রোতের তোড়ে শহরের বিভিন্ন ড্রেনের ময়লা বিষাক্ত পানি, বিভিন্ন কলকারখার বর্জ্য ডাকাতিয়া নদী থেকে মেঘনা নদীতেগিয়ে পড়ে। একারণে বর্ষাকালে ডাকাতিয়া নদীর পানি তেমন দূষিত হয়না। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে ডাকাতিয়া নদীর পানি অনেক কমে যায়। তখন ডাকাতিয়া নদীতে তেমন স্রোত থাকেনা। এ সময় ড্রেন ও কলকারখানার বিষাক্ত পানি, বর্জ্যে ডাকাতিয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি দূষিত হয়ে পড়ে।

রহমাত খালী:

রহমাত খালী নদীর পাড় ঘিরে লক্ষ্মীপুর শহর। একেঁ বেঁকে চলে গেছে মেঘনা নদীতে। এক সময় এ নদী ব্যবহার করতো মধ্য ও নিম্নবৃত্ত পরিবার। মানুষের গোসল, আসবাবপত্র ধোয়া সবই হতো এই নদীতে। কিন্তু সময়ের পালাক্রমে আজ রহমতখালী নদী আর নেই, সেটি এখন পরিণত হয়েছে খালে। কিন্তু তাতেও মানুষের ব্যবহার কমেনি। যথারীতি আগের মতোই ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ নিত্য প্রয়োজনের ব্যবহার করছে। তবে গত ৩/৪ বছর থেকে এ খালের রুপ একেবারেই পাল্টে গেছে। এখন আর মানুষ এই খালে গোসল করে না। তাদের নিত্য কাজে ব্যবহার হয় না। আগে বরশি পিপাসুরা এ খালে বরশি দিয়ে মাছ ধরতে। তখন প্রচুর মাছও পেতে, না পেলেও একটা আনন্দ ছিল। কিন্তু এখন আর বরশি দিয়ে মাছ ধরে না, বালকেরা এখন আর খালে লাপিয়ে পড়ে না। কারণ খালের আগের মত পরিবেশ নেই। খাল চলে গেছে কিছু মানুষের দখলে। শহরের যতো বর্জ আছে, বাসা-বাড়ির ময়লা আবর্জনা, হাসপাতাল-ক্লিনিকের আবর্জনা, বেকারী-ফ্যাক্টরীর আবর্জনা সবই পড়তে এই খালে। খালে আকার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। খাল দখল চলছে হু-হু করে। খাল দখল করে দোকান পাট, বাড়িঘর করছে কিছু অসাধু চক্র। ময়লা আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে সেই খাল। দূর্গন্ধ আর ময়লা আবর্জনা খাল পরিণত হয়েছে মানুষের ঘৃনার পাত্র। কচুরি পেনায় ভরে গেছে খাল। দূর্গন্ধে মানুষ চলা ফেরা করতে পারছে না খালের পাশ দিয়ে।

ভুলুয়া নদী:
ভুলুয়া নদী বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার একটি বড় নদী ছিল । বর্তমানে ভুলুয়া নদী মৃত নদীতে পরিনত হয়ে আছে। এটি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার অন্যতম প্রধান নদী। জেলার পূর্বাঞ্চলে বয়ে যাওয়া এককালের খরস্রোতা ভুলুয়া নদী ভরাট হয়ে এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে। ভুলুয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে জেলা সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। কৃষক অনেক আশা নিয়ে চাষাবাদ করলেও বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় তাদের সব আশা। এক সময়ের প্রমত্ত ভুলুয়া কালক্রমে নদী দূষণ, নদী ভরাট ও পলি জমে জমে মৃত নদীতে পরিনত হওয়ায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এ অবস্থার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মাননীয় প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রব এর সময় ভুলুয়া নদীটি খনন করলে ও ভুমিদস্যুদের কারণে ভুলুয়ার অস্তিত্ব আজ বিলীনের ইতিহাসের পথে।

নদীর এ অবস্থার বাস্তবতা:
মূলত দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে এ সকল নদ-নদী আর খাল। প্রভাবশালী মহল প্রকাশ্য দিবালোকে প্রবাহমান এসব জলাধার দখল করে নির্মাণ করছে বহুতল ভবন।

জানা যায় লক্ষ্মীপুরের পাঁচ উপজেলায় নদ-নদী, খাল ও সংযোগ খালসহ ৭৮টি প্রবাহমান জলধারা রয়েছে।এগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি সরাসরি মেঘনা নদীর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে বেশির ভাগ নদ-খালে চলছে দখলের খেলা। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে দখলদারদের রয়েছে ভীষণ সখ্য। সচেতন মহলের বিশ্বাস এসব নদ-নদী আর খাল যদি অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা যায় তাহলে পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কার হবে। বর্ষায় সৃষ্টি হবে না জলাবদ্ধতা।

কিন্তু মাঝে-মধ্যে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হলেও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবে সৃষ্টি হয় নতুন দখলদার। দখলদাররা প্রথমদিকে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নদ ও খালের ওপর ঘর তোলে। এর পর বহুতল ভবন নির্মাণ করে দখলকে স্থায়ী রূপ দেয়। এ নিয়ে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে রয়েছে দারুণ সমঝোতা। আবার তাদের সঙ্গে সখ্য রয়েছে প্রশাসনের ওপর মহলের। তাই খাল দখলের খেলা চলছেই। অভিযোগ রয়েছে, দখলের এ খেলায় সহযোগিতা করে খোদ ভূমি অফিস।

একটা সময় ছিল যখন এসব নদ-আর খাল দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় নৌকায় পণ্য আনা হতো। তখন এ গুলোই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু একদিকে দখল. অন্যদিকে বছরের পর বছর সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এগুলো। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রবাহমান এ সব জলধারা ওপর ময়লা-আবর্জনা ফেলে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

জেলাবাসীর প্রত্যাশা:
২৮সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস।সারা বিশ্বে পালিত হবে এই দিবস।তাই নদী পাড়ের মানুষ হিসেবে দিবসটির সাথে একাত্বতা ঘোষনা করছি।নদী পাড়ের মানুষরাই পারে নদীকে দখল-দূষন মুক্ত রাখতে।মানুষের শরীরে যেমন রক্ত চলাচলের জন্য রয়েছে হাজারো রক্তনালী,তেমনি নদী হচ্ছে সভ্যতার সেই নালী যেখান দিয়ে সভ্যতার প্রাণ প্রবাহিত হয়।মানুষের শরীরের কোন একটা রক্ত নালী বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা চুপসে গেলে যেমন মানব জীবন নানান হুমকীর মুখে পতিত হয়,তেমনি যেই ভুপ্রকৃতি আমাদের বাঁচার আশ্রয়,তার রক্তনালীসমূহ আমরা স্বার্থপর মানব সমাজ রুদ্ধ করে দিচ্ছি! প্রকারান্তরে কি আমরা নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্বকে হুমকীর মুখে ঠেলে দিচ্ছি না???
আসুন সবাই মিলে সোচ্চার হই..চির যৌবনা,দূরন্ত ডাকাতিয়াসহ জেলার সকল নদ-নদী কে রক্ষা করি দূষণ আর দখল থেকে।ফিরে আসুক সেই কুল কুল ধ্বনি…নির্মল নি:শ্বাস…সুশীতল বাতাস…ফিরে আসুক সুস্বাদু মাছের সেই দিন…আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ বাতাসের নিশ্চয়তা বিধান করি..নদীকে নদীর মত চলতে দিই..পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করি।
সবশেষে ডাকাতিয়া সুরক্ষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে মেঘনার ভাঙ্গনের স্বীকার হাজোরো পরিবারের পাশে দাড়াঁনোর আহবান জানাই।


(বি:দ্র: কাটাখালী, হোড়াখালী এবং ছেউয়াখালী নদের বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করা সম্ভব হয়নি এবং লেখাটি সরাসরি কপি না করে তথ্যসূত্র উল্লেখ করুন মৌলিক তথ্য লেখতে সহায়তা করুন)