এক জেলায় আট নারী ইউএনও

অনলাইন: ওঁরা আটজন, সবাই নারী। সব বাধা পেরিয়ে উন্নয়ন-অগ্রগতির মিছিলের সামনে তাঁরা। হাতে উড়ছে বিজয়ের পতাকা। কণ্ঠে জাগরণের গান। কিশোরগঞ্জের আট উপজেলায় ‘সূর্য রচনা’ করে চলেছেন এই স্বপ্ন-কন্যারা।

হাওরবেষ্টিত এই জনপদের মানুষের কাছে প্রশাসন ছিল অনেকটাই ভোগান্তি আর আতঙ্কের নাম। পারতপক্ষে কেউ এর দ্বারস্থ হতে ইচ্ছুক ছিল না। সেই জনপদ আজ সিক্ত নারীর মমতায়। প্রশাসন আজ একেবারে জনমানুষের কাছাকাছি। মানুষ প্রশাসনকে ভাবছে নির্ভরতার আশ্রয়স্থল হিসেবে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসে থাকা নারী কর্মকর্তার কল্যাণে। কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলা প্রশাসনের আটটিতেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এই নারীরা ‘ইউএনওগিরি’ না করেও সবাইকে নিয়ে এলাকার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। তবে একেকজন একেক বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন—কেউ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কেউবা নারীর উন্নয়ন, কারো অগ্রাধিকার মাদক নির্মূল ও কর্মসংস্থান। কেউ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে। এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক এনায়েত করিম অমি বলেন, ‘এটা কিশোরগঞ্জের জন্য গর্বের বিষয়। নারী ইউএনওদের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে এখানকার বেশির ভাগ উপজেলা। এটা নারী অগ্রগতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও অনুপ্রেরণা।’ জেলা প্রশাসন জানায়, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় মাহমুদা, তাড়াইলে সুলতানা আক্তার, পাকুন্দিয়ায় অন্নপূর্ণা দেবনাথ, কটিয়াদীতে ইসরাত জাহান কেয়া, মিঠামইনে তাসলিমা আহমেদ পলি, বাজিতপুরে সোহানা নাসরীন, কুলিয়ার চরে ড. ঊর্মি বিনতে সালাম ও ভৈরবে দিলরুবা আহমেদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কুলিয়ার চরের ইউএনও ড. ঊর্মি বিনতে সালাম সারা বিশ্বে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক ক্লাসের আয়োজন করে সুনাম কুড়িয়েছেন। তা ছাড়া শিক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় শিক্ষা পদক। শুধু তিনি নন, নারী ইউএনওদের সবাই নিজ নিজ উপজেলায় উন্নয়ন-অগ্রগতির কর্মযজ্ঞে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। হাওরাঞ্চলের প্রথম নারী ইউএনও তাসলিমা আহমেদ পলির নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি প্রত্যন্ত হাওর মিঠামইনের দায়িত্বে রয়েছেন। এই উপজেলা প্রশাসনে একমাত্র নারী কর্মকর্তা তিনি। দুর্গম এলাকা বলে এখানে পুরুষ কর্মকর্তারাও থাকতে চান না। অথচ একজন নারী হয়ে সেখানে দায়িত্ব নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে চলেছেন তিনি। ‘হাওর এলাকায় কাজ করি বলে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি—এটাই আমাকে আনন্দ দেয়।’ কথাগুলো ইউএনও তাসলিমা আহমেদ পলির। অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই এলাকার লোকজন কখনো নারী ইউএনও দেখেনি। তাই মাঠপর্যায়ে কাজ করার সময় লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বিশেষ করে মেয়েদের কৌতূহল বেশি। আমাকে দেখে যদি তারা অনুপ্রাণিত হয় নিজেকে ধন্য মনে করব।’ করিমগঞ্জের ইউএনও মাহমুদা এ বছরের ২১ মার্চ আগের ইউএনও আছমা আরা বেগমের স্থলাভিষিক্ত হন। এখানে দায়িত্ব নিয়ে শুরু থেকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। তিনি জানালেন, সবার সহযোগিতা পাচ্ছেন। উপজেলার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে চান তিনি। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার। ‘লেডি অফিসার বলে কোনো কথা নেই। আমাদের দায়িত্ব ২৪ ঘণ্টার। আমরা ওইভাবে পরিবারকে ম্যানেজ করে কাজ করি। যখনই ডাক পড়বে তখনই ছুটতে হবে—এটা সব সময় মাথায় থাকে আমার। এসব কারণে পরিবার কিছুটা বঞ্চিত হয়। আমার কর্মকৌশল হচ্ছে সবাইকে নিয়ে কাজ করার। নারী হওয়ায় স্বভাবতই নারীদের ব্যাপারে আমার বিশেষ দৃষ্টি থাকে।’ নিজের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বলতে গিয়ে কথাগুলো বলেন তাড়াইলের ইউএনও সুলতানা আক্তার। করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের সংসদ সদস্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমার দুই উপজেলাতেই প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন দুজন নারী কর্মকর্তা। তাঁরা খুবই দায়িত্বশীল ও কর্মঠ। সরকারের রুটিন কাজকর্ম থেকে উন্নয়ন—সবই তাঁরা নিপুণ হাতে দক্ষতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।’ কুলিয়ার চরের ইউএনও ড. ঊর্মি বিনতে সালাম জানালেন, তিনি কুলিয়ার চরের মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী হিসেবে দেখতে চান। এ জন্য ৩০০ ছাত্রীকে বাইসাইকেল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও ঝরে পড়া রোধে দিনরাত কাজ করছেন। এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আরো সেবামুখী করার চেষ্টা করছেন। এসব কাজে স্থানীয় জনমানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন তাঁকে অনুপ্রাণিত করছে। কাজ করতে গিয়ে কখনো মনে হয়নি তিনি একজন নারী। বড় কোনো সমস্যাতেই পড়েননি তিনি। ভৈরবের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা আহমেদ জানালেন, তিনি নিজের সংসার নিজেই সামাল দেন। সকালে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে অফিসে যান। রান্নাবান্না সব নিজেই করেন। বাসায় তাঁর কোনো কাজের লোক নেই। এসব কারণে তাঁকে খাটাখাটনি একটু বেশি করতে হয়। বললেন, ‘আমি কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। এরই মধ্যে উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে একটা বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালাতে গিয়েও কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি আমাকে।’ পাকুন্দিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে বিরোধ থাকলেও অন্নপূর্ণা দেবনাথ ইউএনও হিসেবে যোগদানের পর তা অনেকটাই কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আর নারীরা সমন্বয় করে কাজ করতে পছন্দ করে, আমিও তাই করি। স্বামী-সংসারও একই গতিতে চলছে। ইউএনও হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা নারী অগ্রযাত্রা ও জাগরণেরই ফসল। বাংলাদেশের নারীরা আরো অনেকদূর যাবে।’ কটিয়াদীর ইউএনও ইসরাত জাহান কেয়া ও বাজিতপুরের ইউএনও সোহানা নাসরিন উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে সম্প্রতি কর্মস্থলে এসেছেন। কেয়া এর আগে ঢাকায় পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর হোসেনপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছিলেন সোহানা। দায়িত্ব পালনের শুরুতেই তাঁরা স্থানীয় রাজনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। দুই কর্মকর্তার বক্তব্য প্রায় একই—‘মানুষকে সেবা দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে কাজ করছি।’ কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, জেলার ১৩ উপজেলার আটটিতেই নারীরা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি অনন্য এক উদাহরণ। সফল এসব নারী নিজেদের যোগ্যতায় এই অবস্থানে এসেছেন। যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে উপজেলাগুলোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সামাল দিচ্ছেন। এটি খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়। আমি তাদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতায় সন্তুষ্ট।’