অপরাধে জনপ্রতিনিধিরা

কাজল কায়েস:  ঘটনা এক : সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আহসানুল কবির রিপন সালিসে মাটি কাটা শ্রমিক নুরুল আমিনকে বেত্রাঘাত ও নাকে খত দিতে বাধ্য করেন। এ নিয়ে গত বছরের ১৮ জুন ছবিসহ ‘এ কেমন বিচার!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। উচ্চ আদালত চেয়ারম্যানকে ভর্ত্সনা করেন। এ সময় আইন নিজের হাতে না তুলে নিতে স্বরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সারা দেশে সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যানের প্রতি নির্দেশনা পাঠাতে বলেছেন আদালত।

ঘটনা দুই : গত বছরের শুরুতে কমলনগর উপজেলার চরমার্টিন ইউপির চেয়ারম্যান ইউছুফ আলী মিয়া সালিসে এক কিশোরীসহ দুজনকে লাঠিপেটা করেন। এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে উচ্চ আদালত ইউপি চেয়ারম্যান ও থানার ওসিকে হাজির হতে বলেন। পরে তাঁরা দোষ স্বীকার করে নিঃর্শত ক্ষমা চান।

ঘটনা তিন : গত ৯ জুন সদরের বালুর চরে পুলিশের ওপর হামলা হয়। এ ঘটনায় চররমণীমোহন ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল খালেক গোলদারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরে জেলা পরিষদ, পাঁচটি উপজেলা পরিষদ, চারটি পৌরসভা ও ৫৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। প্রায় ১৮ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ জেলায় জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ৮৪৭ জন। এর এক-চতুর্থাংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।

আরো অভিযোগ : গত ১৩ মে রাতে সদরের লাহারকান্দি ইউপির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মুশু পাটওয়ারীকে ইয়াবাসহ আটক করে র‌্যাব-১১। ১৫ মে সদরের তেওয়ারীগঞ্জ ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ওমর ফারুককে ২৩ পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়। ১৮ মার্চ এক ব্যক্তির পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগে দত্তপাড়া ইউপির চেয়ারম্যান আহসানুল কবির রিপনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। উত্তর জয়পুর ইউপির চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী পৃথক ঘটনায় এক মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় দৈনিকের সম্পাদককে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠান। এক তরুণীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে দিঘলী ইউপির চেয়ারম্যান শেখ মজিবের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়।

এ ছাড়া রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউপির চেয়ারম্যান মো. হোসেন রানা জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে ওয়ারিশি সনদ দেওয়ায় আদালতে মামলা হয়। তিনি প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া ব্যাবসায়িক কারণে প্রায়ই চীনে থাকেন। উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভায় উপস্থিত থাকেন না। সম্প্রতি আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় ভোলাকোট ইউপির চেয়ারম্যান বশির আহমেদ মানিকের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। চণ্ডীপুর ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য খিজির আহমেদ ও ইছাপুর ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিল্লাল হোসেন এক নারীকে খেজুরের রস চুরির অভিযোগে বিবস্ত্র করে মারধর ও গরু লুট করেন। এ মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ভোলাকোট ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আরিফ হোসেন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীকে বিয়ে করে সমালোচিত হন। মাদকদ্রব্যসহ ইছাপুর ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফয়েজ আহমেদ দুঃখু চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে ১৬ এপ্রিল এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এক সালিসে তাঁর ৬০ হাজার টাকা জরিমানা হয়।

লক্ষ্মীপুর সদরের মান্দারী ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজি মামলা হয়।

রায়পুর থানা সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হয়েছেন নাশকতা মামলায় চরপাতা ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমিন পাটওয়ারী, মাদক মামলায় রায়পুর ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কামাল হোসেন জমাদার, ডাকাতি মামলায় কেরোয়া ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আরিফুর রহমান, নাশকতা মামলায় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আজম ও নারী নির্যাতন মামলায় সোনাপুর ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন। মারধর করার অভিযোগে চরপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে।

রামগতি ও কমলনগর থানা সূত্র জানায়, রামগতির চর-আবদুল্লাহ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ মামলার আসামি ওই ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শেখ ফরিদ ওরফে শেখাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় এই ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল মতিনও আসামি। কমলনগর উপজেলার চরফলকন ইউপির চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ভাতাপ্রাপ্ত জীবিত এক ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়েছেন। পরে অন্যের নামে ভাতাবই ইস্যু করেন।

জেলা ইউপি চেয়ারম্যান ফোরামের আহ্বায়ক ও তেওয়ারীগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান ওমর হুসাইন ভুলু বলেন, চেয়ারম্যানরা যদি দিনদুপুরে অপরাধ করেন, জনগণ কার কাছে যাবে?

লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলীয় প্রতীক ও সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হচ্ছেন। তাঁরা টাকা উত্তোলনের জন্য বেপরোয়াভাবে যা ইচ্ছা তা-ই করছেন।

জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রিয়াজুল কবির বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জন চন্দ্র পাল বলেন, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি মোহাম্মদ নোমান বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মেধা, মনন, মানসিকতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় সমৃদ্ধ হতে হয়।

সৌজন্যে: কালেরকন্ঠ