নির্বাচন ঘিরে জেলা ব্যাপী ভোটারদের মাঝে আতংক

নিজস্ব প্রতিনিধি: মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই লক্ষ্মীপুর সদর,রামগঞ্জ,রামগতি,রায়পুর উপজেলার নির্বাচন। কিন্তু সর্বত্র চাপা আতঙ্ক,কে কখন হামলার শিকার বা গ্রেপ্তার হন। জীবন বাঁচাতে বা গ্রেপ্তার এড়াতে বিভিন্ন দলের অগণিত রাজনৈতিক কর্মী এখন এলাকাছাড়া। সাধারণ মানুষ যাঁরা এলাকায় আছেন, তাঁরাও অনেকটা বোবা। নির্বাচন নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। সাধারন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সবারই এক কথা, আতংক। তাই ভোটে কে জিতল, কে হারল—এ নিয়ে যেন কোনো মাথাব্যথা নেই তাদের। শেষ পর্যন্ত
এ জেলার ৪টি উপজেলার নির্বাচন উৎসব না হয়ে আতংকে পরিণত হতে যাচ্ছে বলে ধারণা সাধারণ মানুষের। এমন আতংকের পরিস্থিতিতে ভোটের দিন মহিলা সহ ভোটার উপস্থিতি একেবারেই কমে যেতে পারে। আতংকের কারণ ইতোমধ্যে মাঠ পর্য়ায়ে জোরে শোরে দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনিই ছোট বড় কোন না কোন ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রার্থীদের ও পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন চলছে।

সদর

সর্বশেষ শনিবার লক্ষ্মীপুর জেলা শহরে নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু। তিনি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে, তাকে ও হুমকি দেয়ার হচ্ছে। সদর উপজেলায় এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপুর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপি সমর্থিত মাহমুদুল করিম দিপু, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন বকুল ও আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ফিরোজ আলম। সংবাদ সম্মেলনে জনাব টিপু বিএনপি সমর্থিত দিপুর বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি সন্ত্রাসের অভিযোগ করেন। তার ভাষায় “দিপু পূর্বাঞ্চলের সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করে চন্দ্রগঞ্জ, উত্তর জয়পুর, চরশাহী, দিঘলী এবং কুশাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র মহড়া দিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।” আগামী ৩১ মার্চ ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম আলাউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহিম উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে জেলা শহরে বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহমুদুল করিম দিপু অভিযোগ করে বলেন,আওয়ামীলীগ প্রার্থী সালাহ উদ্দিন টিপুর সমর্থকরা তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বলছে। সরে না দাঁড়ালে হত্যার করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে। তার অভিযোগ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। তার প্রচারণা কাজে ব্যবহৃত মাইক ভাংচুর ও ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। মাহমুদুল করিম অভিযোগ করেন, প্রশাসন কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর মালিকানাধীন একটি ইটভাটা শুক্রবার ভাঙচুর করে বন্ধ করে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাছিবুর রহমান, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান ছুট্টু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ব্যাপারী প্রমুখ।

রামগঞ্জ
রামগঞ্জে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুর রহিমের বাড়িতে দুবার হামলা ও গুলি বর্ষণের ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার রামগঞ্জ শহরের বিএনপি প্রার্থীর বাস ভবনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, আওয়ামীলী সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আ ক ম রুহুল আমিন তার লোকজন দিয়ে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। এ ছাড়া তারা পুলিশ প্রশাসন দিয়ে নানা ভাবে তাদের হয়রানি করছে।
কিন্তু আওয়ামীলী সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আ ক ম রুহুল আমিন তার বিরুদ্ধের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদ, উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বাহার, এল ডি পি’র কেন্দ্রিয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাচ্চু, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান, উপজেলা যুবদলের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন পলাশ ও ছাত্রদলের সভাপতি রিপন প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনের পর বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার দিকে ‍দ্তিীয় দফায় তার বাড়িতে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ও প্রতিদিনিই বিভিন্ন এলাকায় নানা অঘটন ঘটেই চলছে।

রায়পুর
শনিবার বিকেলে হায়দরগঞ্জ বাজারের নির্বাচনীয় কার্যালয় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী আলহাজ্ব হাবিবুর রহমান মিন্টু সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত অভিযোগে জানান, ২৭ মার্চ রাত সাড়ে ৯ টায় যুবলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র মোহড়া দিয়ে দুই শিক্ষককে কুপিয়ে আহত, ২৮ মার্চ রাত সাড়ে ১১ টায় চরআবাবিল ইউনিয়নের জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল কাদের ও ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেনকে পিটিয়ে আহত করে তাদের বসতবাড়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাপক ভাংচুর করে। ২৯ মার্চ সকাল ১০ টায় দক্ষিন চরবংশি ইউনিয়নের জামায়াত নেতা নুর আলম ও আফাজ উদ্দিনকে পিটিয়ে আহত করে পুলিশের হাতে সোর্পদ করে। একই দিন দুপুর দেড় টায় উদমারা গ্রামের ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. মানিককে অপহরণ করে নিয়ে যায় ১০/১২ জন যুবলীগ কর্মী। চরআবাবিল ইউনিয়নের ক্যাম্পেরহাট এলাকার দুই হিন্দু নেতা ও তাদের পরিবারকে নানান ভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এসব অভিযোগ ছাড়াও ৭২টি কেন্দ্র ৩৮টি কেন্দ্র ঝুকিপূর্ণ বলে প্রশাসনকে অবহিত করলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা বলে অভিযোগ করেন। এসময় উপস্থিতি ছিলেন, অপর চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ তাহের উজ্জুদিন জাবেরি আল মাদানি, জামায়াত নেতা আনম আবুল খায়ের, মাওলানা নাজমুল হুদা, জহিরুল ইসলাম, মহিউদ্দিন হাওলাদার, নাজির আহম্মেদ ও ফখরুল ইসলাম প্রমুখ। যোগাযোগ করা হলে আ.লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আনোয়ার গাজী ও যুবলীগ নেতা কৌশিক আহমেদ সোহেল বলেন, জামায়াত প্রার্থী অভিযোগ সঠিক নয়। আ.লীগ প্রার্থী মাস্টার আলতাব হোসেন হাওলাদারের জয় নিশ্চিত ভেবে মিথ্যা অপ-প্রচার চালাচ্ছেন।

রামগতি

উপজেলা নির্বাচন হলেও তিন হেভিওয়েট যথা বর্তমান সরকার দলীয় এমপি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মামুনের প্রার্থী আবদুল ওয়াহেদকে। ১৯ দলীয় প্রার্থী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে সমর্থন দিচ্ছেন সাবেক এমপি এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। শরাফ উদ্দিন সোহেল আজাদের সাথে আছে শফিউল বারী বাবুর পুরোপুরি সমর্থন। অন্য দিকে সাবেক মেয়র আজাদ উদ্দিন চৌধুরী। নিজেদের অস্তিত্ব ও ইমেজ উদ্বারের প্রচেষ্টা হিসেবে এই চর অধ্যুষিত অঞ্চলেও হানাহানির আশংকা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আচরণবিধি লঙ্ঘনের কিছু অভিযোগ পেয়েছি। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।’এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুলত লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার নির্বাচনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি উৎকন্ঠা।

গত ১৫ মার্চ কমলনগরের নির্বাচনে ৫টি কেন্দ্রে সহিংসতা হয়। শেষ নাগাত চেয়ারম্যান,ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়।

৩১ মার্চ নির্বাচনে রামগতি,রামগঞ্জ,রায়পুর এবং লক্ষীপুর সদরের নিবাচন অনুষ্ঠিত হবে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা একটি পৌরসভা ও ২১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। মোট ভোটারসংখ্যা চার লাখ ২৫ হাজার ৭৪৬। পুরুষ ভোটার সংখ্যা দুই লাখ এক হাজার ৬৬৫ ও নারী ভোটার এক লাখ ৯১ হাজার ৩২০ জন।

রামগঞ্জ উপজেলা ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটারসংখ্যা এক লাখ ৮৫ হাজার ২১০ জন। পুরুষ ভোটার ৭১ হাজার ৬৭১ জন ও মহিলা ভোটার ৯৪ হাজার ৭৬৮ জন। কেন্দ্র ৮১টি ও মোট বুথ সংখ্যা ৪৭৮টি।

রায়পুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৭৩ হাজার ২শ ২২। পুরুষ ভোটার ৮৫ হাজার ৫শ ৮৪ ও মহিলা ভোটার ৮৭ হাজার ৬শ ৩৮। কেন্দ্র হবে ৭২টি এবং বুথ থাকবে ৪শ ৫০টি।

রামগতি পৌরসভা এবং চরবাদাম, চরপোড়াগাছা, চরআবদুল্যাহ, চরআলেকজান্ডার, চরআলগী, চররমিজ, বড়খেরী ও চরগাজীসহ আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় ভোটার এক লাখ ৪২ হাজার ৪৬২ জন। এদের মধ্যে ৭১ হাজার ১৯ জন পুরুষ এবং ৭১ হাজার ৪শ ৪৩ জন নারী ভোটার রয়েছেন।