ক্রিকেটে মজিয়া যায় যে বেলা

সারোয়ার মিরন: নির্মল আনন্দ আর বিনোদনের মাধ্যম ক্রিকেট এখন পুঁজিপতিদের হাতের নাটাই। যেমনি ঘুরায় তেমনি ঘুরে!! কাঁদায় হাসায়। জুয়াড়িরা পসরা সাজায় দরদামের। বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রনে জুয়াড়িদের একোন ওকোন। দেশ থেকে দেশে নখদর্পনে। বিভিন্ন প্রয়োজনে বৃহত্তর নোয়াখালীর বেশ কয়েকটি উপজেলায় আমাকে বেশ কয়েকদিন করে অবস্থান করতে হয়েছে। ছিলাম রাজধানী ঢাকায় এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। খেলার সময় হলেই ইচ্ছা করেই ঢুঁ মারতাম পাড়ার চা দোকানে। দেখতাম বুঝতাম ক্রিকেট জুয়ার ওপেন সিক্রেট আসর। প্রতি বলে, ওভারে, প্রতি ম্যাচে, হার-জিতে, দল ঘোষনা ও সাজানোতে, এক রানে, দু’রানে, বলায় কয়ায় সব ক্ষেত্রেই চলে জুয়া। একমাত্র ম্যাচের হার-জিতে জুয়ার টাকা ম্যাচের পরে লেনদেন হয়। অন্যসব ক্ষেত্রে হয় নগদ নগদ। আমার এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্রও। কোন ধরনের খেলা না থাকলে রিপিট খেলা গুলোতেও চলে জুয়ার মেলা!!!
পাড়ার আবাল শিশু বৃদ্ধ বনিতা সকলের কাছে স্মার্টফোনে ক্রিকইনফো কিংবা বাজির দরের এ্যাপস্। বাজির দরসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি ক্যালকুলেশন করা হয় অনলাইন সফট্ওয়্যারে। জুয়াড়িদের কাছে নিজ ঘরের খবর না থাকলেও খবর থাকে সুদূর অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের ছোট খাটো সব ক্লাব ক্রিকেটের আয়োজনের খবর। কখন কোন ক্লাব খেলছে, কারা কারা খেলছে সব হাতের মুঠোয়। বাজির দরও এ্যাপস্ এ দেয়া। দেশ কিংবা দল ভেদে বাজির দর ওঠে একের বদলে নয় দশগুন। কথিত আছে ক্রিকেট জুয়ার মারপ্যাঁচে পড়ে খুন হয়েছে পাকিস্তানের সাবেক কোচ বব উলমার। গুঞ্জন আছে দক্ষিণ আফ্রিকার হ্যান্সি ক্রোনিয়ে এর বিমানক্র্যাশ ঘটনাটিও বাজির সাথে পরোক্ষ ভাবে জড়িত। এছাড়াও ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিং তো ষাটের দশক থেকেই ওপেন সিক্রেট ব্যাপার।
কিছু দিন আগে চট্টগ্রামে ক্রিকেট বাজিতে নিয়মিত অংশ নেয়া একজনের সাথে এ বিষয়টা নিয়ে আলাপ করতেই বেরিয়ে এলো চা ল্যকর সব তথ্য। ক্রিকেট জুয়া নিয়ন্ত্রন এবং বাজির দর নির্ধারন হয় বাহিরের দেশ থেকে। আমাদের দেশে বিভাগ ও কেন্দ্র অনুযায়ী প্রতিনিধিত্ব করা লোকও আছে। দেশব্যাপী সম্পাদিত সব বাজির একটা অংশ যায় ঐসব রাঘব বোয়ালদের হাতে। গ্রাম বা পাড়া পর্যায়ে আছে টং দোকানী। অনেকটা এজেন্ট এর মতো। মিড়িয়া হিসেবে কাজ করে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেন এসব অস্থায়ী দোকানী। বাজি সংক্রান্ত লেনদেনের প্রভাবে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও খুন-খারাপি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একবার এক ছোট ভাইকে এসএসসি পরীক্ষাকালীন সমেয় জিজ্ঞাসা করলাম, কিরে এতো রাতেও খেলা দেখছিস? তার সপ্রভিত জবাব, বিশ^কাপ ক্রিকেট তো চার বছর পরপর আসে আর পরীক্ষা তো প্রতি বছরই আসবে। জনশ্রুতি আছে, হিটলারের দেশ জার্মানিতে চারদিন ব্যাপী টেষ্ট ক্রিকেট খেলায় হিটলারকে প্রধান অতিথি করে নিমন্ত্রন করা হয়েছিলো। চারদিন ধরে খেলা চলার পর টেস্টম্যাচটি ড্র হয়। এতে করে রাগত হিটলার বলছিলেন চারদিন ধরে খেলা চলার পরেও যে খেলায় কেউ জেতে না সে দেশে এমন সময় অপছয়ী খেলা চলার কোন কারনই হয়না। নিষিদ্ধ করলেন ক্রিকেট!!! সূর্যোদয়ের দেশ জাপান ক্রিকেট খেলেনা সময় অপছয় হয় বলে!!

আমাদের ধ্যানে জ্ঞানে, মন-মগজে ক্রিকেট হুহু করে প্রবেশ করছে। একটা প্রজন্ম ক্রিকেটেই মশগুল। তা না হলে হারলে গালি আর জিতলে অতি আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে হবে কেন? নিছকই বিনোদন কিংবা খেলায় কেন নাগিন ড্যান্স দিতে হবে অফিসিয়ালসদেরও!! ক্রিকেট কেন হবে বৈশি^ক রাজনীতির নিয়ামক!! কোটি কোটি ডলার উড়বে কেন জুয়ায়!! গোপন লেনদেন হবে কোন সভায় সভায়? সর্বপোরি বিনোদন আর আনন্দের খেলা ক্রিকেট এখন প্রায়শই বিষাদের জন্ম দেয়। খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে তিন চারদিন ধরে আলোচনা সমালোচনা। আলোচনার রেশ থাকে ক্লাসে এবং অফিস পাড়ায়। বাসায় বাসায় চলছে ক্রিকেট ক্রেজ। অনেক তরুন ও বাচ্চাকে দেখছি অকারনে বোলিং করার হাত ঘুরায়, ব্যাটিং প্র্যাকটিস করে। স্কুল থেকে ফিরে নাওয়া খাওয়া ভুলে ক্রিকেট কোচিংএ দৌড়। স্টেডিয়াম পাড়ায় ঢুঁ মারলেই বোঝা যায় শিশু কিশোরদের সবাইকে ক্রিকেটার হতে হবে এমন ভাব।

আমরা খেলাকে নিছকই খেলা ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চাই। জুয়া কিংবা বিভাজন, ট্রল চাই না। নিপাট ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট আমাদের ভাবাবে, হাসাবে, কাঁদাবে এটাই স্বাভাবিক। কথা হলো শুধুমাত্র খেলায় মেতে-মজে থেকে ভাবাবে, হাসাবে কিংবা কাঁদাবে এমন সংকীর্নতায় থাকা কোনকালেই কাম্য নয়। কেবলই খেলা ক্রিকেট সেটা আবেগের জায়গায় রেখে অন্যসব সামাজিক অবক্ষয় রোধে আত্মমানবতার সেবায় এ প্রজন্মকে মগ্ন থাকতে হবে। জাগতে হবে সকল অন্যায় ও শোষনের বিরুদ্ধেও। দেশপ্রেম শুধু খেলা দেখায় প্রকাশ করার সংকীর্নতা থেকে বেরিয়ে সর্বক্ষেত্রেই দেশপ্রেম প্রকাশে এ প্রজন্মের ভূমিকা রাখতে হবে । শিক্ষা নেবার চেষ্টা করতে হবে ক্রিকেটীয় রসায়ন থেকে। তবেই খেলার মর্মার্থ প্রকাশ পাবে।