আজ লক্ষ্মীপুরের ৯ গ্রামের ৫ শতাধিক মুসল্লি ঈদ উদযাপন করছেন

raipur-korbaniসানা উল্লাহ সানু: সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও শনিবার কোরবানী ও ঈদ উদযাপন করছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, রামগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৯টি গ্রামের প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার। গ্রামগুলো হচ্ছে রায়পুরের উপজেলার বামনী ইউনিয়নের কলাকোপা, রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুর, নোয়াগাঁও, জয়পুরা, বিঘা, দক্ষিণপাড়া, সদর উপজেলার পূর্বপাঁচপাড়া, মহাদেবপুর, চন্দ্রগঞ্জ থানার বাংলাবাজার।

আজ শনিবার আরব বিশ্বের সাথে মিল রেখে পশু কোরবানী দিয়ে ঈদ উদযাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় একাধিক সূত্র।
সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে ধর্মীয় রীতি পালনকারী এ সকল গ্রামবাসী মূলত চাদঁপুরের হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরীফের পীর মরহুম মাওলানা ইসহাকের (রহ.) এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মির্জাখিল দরবার শরীফের মরহুম হাফেজ আব্দুল কাদের (রঃ) এবং মৌলভী সৈয়দ আহমদের অনুসারী ।

raipur-dorbarরায়পুর: শুক্রবার লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব প্রতিনিধি তবারক হোসেন আজাদ সরেজমিনে রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের কলাকোপা গ্রামের মোলায়ম ভূইয়া বাড়ীর দরবার শরীফে গিয়ে আজ শনিবার ঈদুল আযহা উৎযাপন ও পশু কোরবানীর বিষয়টি নিশ্চিত হন।
কলাকোপা গ্রামের জাহাগিরিয়া দরবারের খাদেম মাওলানা এএমএম আনিছুর রহমান লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি কে জানান আজ কোরবানীর জন্য নব্বই হাজার টাকা মূল্যের ৩ টি গরু কোরবানী করা হয়েছে। সকাল ৮টায় এখানের ঈদের জামাত পরিচালনা করেন মাওলানা একেএম আতাউর রহমান। যাতে প্রায় অর্ধশত মুসুল্লী অংশ গ্রহন করেন।
খাদেম বলেন, তার দাদা মরহুম হাফেজ আব্দুল কাদের (রঃ) চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মির্জখিল দরবার শরীফ থেকে খিলাফত নিয়ে কলাকোপায় আসেন । তিনি মূলত সৌদি অনুসারী ছিলেন । সেই থেকে তার উত্তরসুরীরা সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে রমজান, ঈদ, হজ্জ্ব ও পশু কোরবানী দিয়ে আসছে । রায়পুরের এ গ্রামে আব্দুল কাদের (রাঃ) মাযার-কে ঘিরে শতশত মুরিদদের আগমন ঘটে।
অন্যদিকে কলাকোপা গ্রামে মৌলভী সৈয়দ আহমদের দরবার শরীফ কেন্দ্রকি আরো প্রায় অর্ধশত লোক ও একই দিন ঈদ উদযাপন করেছেন।

রামগঞ্জ: আমাদের রামগঞ্জ প্রতিনিধি জাকির হোসেন মাস্তান জানান, ৩৫ বছর ধরে রামগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দুশতাধিক পরিবার সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাধি পালন করে আসছেন।
নোয়গাও ঈদগাও কমিটির সভাপতি নেছার আহম্মেদ ও বিঘা ঈদগাও কমিটির সভাপতি হারুন রশিদ জানান, সকাল দশ টায় কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের পূর্ব বিঘা গ্রামে মাওঃ মনির হোসেন, নোয়াগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিনপাড়া নূরানী মাদ্রাসা মাঠে মাওঃ নেছার আহম্মেদ খান ও সোনপূর খানকায় মাওঃ রুহুল অমিনের নেতৃত্বে ঈদের জামায়ত অনুষ্ঠিত হয় । ঈদের নামাজ আদায় করার পর তারা পশু কোরবানী করেছেন।

চাদঁপুর: চাদঁপুরের সাংবাদিক আবদুর লতিফ জানান, চাঁদপুরে ৫০টির মতো গ্রামেও আজা ঈদ উদযাপন করছেন কয়েক হাজার মুসল্লি।
খোজঁ নিলে চাদঁপুরের হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরীফের খাদেম মাওলানা শাহাজান মিয়া জানান, হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরীফের পীর মরহুম মাওলানা ইসহাকের (রহ.) অনুসারীরা প্রতিবছর পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদিনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লক্ষ্মীপুর এবং চাদঁপুর জেলার কয়েকটি স্থানে রোজা, ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।

সৌদিআরবের সাথে মিল রেখে ঈদের প্রথাচালু:
দীর্ঘ ৮৬ বছরেও চাঁদপুরে আগাম ঈদ উদ্যাপন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান হয়নি। হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরীফের প্রায় লক্ষাধিক অনুসারী এবারও আরব দেশসূমহের সাথে সংগতি রেখে ঈদুল আযহা উৎযাপন করছেন। চাঁদপুরের ৪০টি গ্রামে ঐ দরবার শরীফের অনুসারীরা দেশের নিয়মের একদিন আগে ঈদ পালন করে। গত ৮৫ বছর যাবতই আরব দেশসমূহের সাথে সঙ্গতি রেখে সাদ্রাসহ ৪০টি গ্রামে ঈদ উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা গ্রামে ১৯২৮ সাল থেকে একদিন আগে ঈদ উদ্যাপন প্রথা চালু করলেও এখন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ একদিন আগে ঈদ উদ্যাপন করছে। ১৯২৮ সালে হাজীগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইছহাক খান আরব দেশ সমূহের সাথে সঙ্গতি রেখে ঈদ উদ্যাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু স্থানীয় গ্রামবাসী অসহযোগিতা করলে সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। দেশে সরকারি নিয়মের বাইরে একদিন আগে ঈদ পালনের উদ্যোগ গ্রহণের দায়ে মাওলানা খানকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান মাওলানা খান ওই বছরই চলে আসেন নিজ গ্রাম একই উপজেলার সাদ্রায়। আরব দেশসমূহের রীতিনীতি অনুযায়ী ধর্ম-কর্ম পালনের জন্য প্রথমে নিজ গ্রামে শুরু করেন ব্যাপক গণসংযোগ। গ্রামের অসহায়, দুঃস্থ মুসলমানদের প্রচুর আর্থিক সাহায্য দিয়ে আরব দেশগুলো সাথে সংগতি রেখে একদিন আগে ঈদসহ সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদ্যাপন প্রথা চালু করেন। মাওলানা খানের মতে হানাফি, মালেকি ও হাম্বলী মাজহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদসহ সর্বপ্রকার ধর্মীয় কার্যক্রম বিশ্বের সকল দেশে একসাথে পালিত হবে।

তাদের ব্যাখা:
বাংলাদেশ পবিত্র কাবা ঘর থেকে ৫০.১২ দ্রাঘিমাংশ পূর্বে অবস্থিত। মক্কার সাথে রাজধানী ঢাকার সময়ের ব্যবধান ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। সময়ের ব্যবধান এত অল্প হলে একসঙ্গে রোজা রাখা ঈদ উদ্যাপন করতে বাধা থাকার কথা নয় বলে তাদের দাবি।

অনুসারীদের বংশপরিক্রমা:

মাওলানা ইছহাক খান ১৯৮৫ সালে ১৩ নভেম্বর ইন্তেকাল করলে তার কবরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাজার। তার ৬ ছেলে ও ১ মেয়ে। তারা হচ্ছেন- মাওঃ আবু জাফর হাই, আলহাজ্ব মাওঃ আবু বকর, মোঃ ঈসমাঈল, মাওঃ আবুল খায়ের, মাওঃ মোঃ শেখ ইলিয়াস, আলহাজ্ব মাওঃ আবু ইয়াহিয়া, মোঃ জাকারিয়া আলমাদানী, হাফেজ মাওঃ আহাম্মদ হোসাইন, মাওঃ শাহ মোঃ হাসান ও ওয়াহরেহা ফাতেমাতুজ জোহরা।
৬ সন্তানই পিতার মতবাদ প্রচারে সদা নিবেদিত। সেই সাথে ওই মতবাদ প্রচারে কাজ করছেন মাওঃ ইছহাক খানের অসংখ্য মুরীদ। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে ওরস মাহফিলও হয় পৃথক পৃথকভাবে।
একদিন আগে ঈদের জামাত করা নিয়ে মতবিরোধের সৃষ্ট সংঘর্ষে ১৯৮৬ ও ’৮৭ সালে দুই ঈদে দু’শতাধিক মানুষ আহত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর সাদ্রাসায় ঈদের দিন ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সাদ্রা ছাড়াও চাদঁপুরের ৪০টি গ্রামের একাংশে ওই পীরের অনুসারীরা সৌদির সাথে ঈদ উৎযাপন করেন। গ্রামগুলো হচ্ছে ঃ হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল, শ্রীপুর, মনিহার, বরকুল, অলীপুর, বেলচোঁ, রাজারগাঁও, জাকনি, কালচোঁ, মেনাপুর, ফরিদগঞ্জ উপজেলার শাচনমেঘ, খিলা, উভারামপুর, পাইকপাড়া, বিঘা, উটতলী, বালিথুবা, শোল্লা, রূপসা, গোয়ালভাওর, কড়ইতলী, নয়ারহাট, মতলবের মহনপুর, এখলাসপুর, দশানী, নায়েরগাঁও, বেলতলীসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম।